• আঙুল তুলে কথা বলবেন না: ক্ষিপ্ত অভিষেক
    এই সময় | ০১ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: কলকাতার পরে এ বার দিল্লিতে সংঘাতের আবহ! দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের তুমুল সংঘাতের জেরে জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে ফের তপ্ত রাজধানী। ’২৬–এর বিধানসভা ভোট ঘোষণার আগে থেকেই কখনও ভূতুড়ে ভোটার, কখনও বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) ইস্যুতে কমিশনকে নিশানা করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। তবে ২০২৫–এর শেষ দিনে সরাসরি নয়াদিল্লিতে নির্বাচন সদনে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের সামনেই তাঁর বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক।

    ‘সার’–এর হিয়ারিংয়ের আগে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির নিরিখে যে ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে চিহ্নিত করেছি‍ল কমিশন, তাদের সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশের দাবিতে সরব হয়েছিলেন অভিষেক। বুধবার তাঁর নেতৃত্বেই তৃণমূলের প্রতিনিধিদল ওই তালিকা প্রকাশ–সহ একগুচ্ছ দাবিতে দেখা করে জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে। সেই বৈঠক চলাকালীন সিইসি রীতিমতো আঙুল উঁচিয়ে ‘অভদ্র আচরণ’ করেছেন বলে বেনজির অভিযোগ তুলেছেন অভিষেক।

    দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টার বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে কার্যত বিস্ফোরক মেজাজে ধরা দিলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের সময়ে অভিষেক স্পষ্ট জানান, গণতন্ত্রের প্রহরীর ভূমিকায় থাকা এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের কাছ থেকে এমন আচরণ ‘অপ্রত্যাশিত’ এবং ‘অগণতান্ত্রিক’। তাঁর অভিযোগ, ‘আলোচনার টেবিলে বসে যুক্তি দিয়ে কথা বলার বদলে মেজাজ হারিয়েছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।’ অভিষেকের আরও বক্তব্য, ‘আমি কথা বলছিলাম আর উনি আমার দিকে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলছিলেন। আমি ওঁকে পরিষ্কার বলেছি, আঙুলটা নীচে নামান। আমি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি, কারও মনোনীত নই। আমরা কি বন্ডেড লেবার না ক্রীতদাস? দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধানকে ধ্বংস করার জন্য এই কমিশনারকে বসানো হয়েছে।’ সরাসরি সিইসি–র নাম করে অভিষেক বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমারকে বলুন, এ দিনের বৈঠকের আড়াই ঘণ্টার ভিডিয়ো ফুটেজ প্রকাশ করতে৷ সাহস থাকলে প্রকাশ করে দেখান উনি৷ জিতনা তাকত লগানা হ্যায় লগাও, সব কুছ লগাও, জনতা হমারে সাথ হ্যায়৷’

    এ দিনের ঘটনা নিয়ে কমিশনের তরফে অবশ্য কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। সিইসি–ও কোনও মন্তব্য করেননি। তবে অভিষেক সিইসি–র বিরুদ্ধে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলার যে অভিযোগ তুলেছেন, তার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলে‍ন, ‘ভিতরের ভিডিয়ো ফুটেজ তো নেই! ফলে কী হয়েছে, সেটা বলা মুশকিল। আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ডুবে থাকা তৃণমূল নেতারা সত্যি কথা বলবেন, এটাও আশা করা যায় না। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক সংস্থা। রাজনৈতিক নেতাদের থেকে উপরে। এটা ভুলে গেলে চলবে না। তৃণমূলই প্রোপাগান্ডা করছে।’

    কমিশনের কাছে অভিষেকের তোলা ১০টি ইস্যুর মধ্যে অন্যতম ছিল ১ কোটি ৩৬ লক্ষ লোকের ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির বিষয়টি। কমিশন বাংলার এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের নথিতে গরমিল আছে দাবি করলেও কেন সেই তালিকা প্রকাশ করছে না, তা নিয়ে সরব হন তিনি। একইসঙ্গে বাংলার খসড়া তালিকা থেকে ৫৮ লক্ষ নাম উধাও হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিষেক বলেন, ‘যাঁরা ফর্ম ভরেননি, তাঁদের নাম বাদ যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু জীবিত ব্যক্তিদের নাম কী ভাবে বাদ গেল?’ বিজেপির অপপ্রচারের পাল্টা হিসেবে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, ‘ওই ৫৮ লক্ষ নামের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা আছে? এর শ্বেতপত্র প্রকাশ করুক কমিশন।’ সাংসদের দাবি, এর কোনও সদুত্তর কমিশন দিতে পারেনি।

    অভিষেকের অভিযোগে উঠে এসেছে ইচ্ছাকৃত ভাবে বাংলাকে ‘টার্গেট’ করার প্রসঙ্গও। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তামিলনাড়ু বা উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে এক নিয়ম চললেও বাংলার ক্ষেত্রে কেন আলাদা বিধি? কেন শুধু বাংলার জন্যই বিশেষ অবজ়ার্ভার নিয়োগ করা হচ্ছে?’ এমনকী প্রবীণ ও অসুস্থ নাগরিকদের বাড়িতে গিয়ে ভেরিফিকেশন না করে কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড় করিয়ে হেনস্থা করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অভিষেক। প্রসঙ্গত, ‘সার’–এর হিয়ারিং পর্বে শুধুমাত্র বাংলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার আধিকারিকদের মাইক্রো অবজ়ার্ভারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপরেই এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই ভাবে শুনানি পর্বে কেন বুথ লেভেল এজেন্টদের রাখা হচ্ছে না, তা নিয়েও মমতা–অভিষেকরা সরব হয়েছেন। এ দিন জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে সাক্ষাতের পরে অভিষেক প্রশ্ন তোলেন, ‘সরকার হোয়াটসঅ্যাপে দেশ চালাতে চাইছে? তা হবে না। বিএলও-২দের শুনানিতে থাকতে দিতেই হবে এবং যথাযথ নোটিফিকেশন জারি করতে হবে।’ কমিশনকে বিঁধতে গিয়ে তাঁর সংযোজন, ‘ভোট চোর কে? গুগলে সার্চ করলেই পাবেন।’ সবশেষে দিল্লির বুক থেকে তাঁর হুঁশিয়ারি— ‘বাংলার মেরুদণ্ড বিক্রি হওয়ার নয়, এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেস আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই জারি রাখবে।’

  • Link to this news (এই সময়)