বাড়ি গিয়ে শুনানির সংখ্যা তুলনায় বাড়ল। তবে বুধবারেও রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণের একাধিক জেলায় সে প্রক্রিয়া শুরু হয়নি বা প্রত্যাশিত গতি পায়নি। শুনানিকেন্দ্রে অতি প্রবীণ, বিশেষ ভাবে সক্ষমদের ভোগান্তির দৃশ্যও নজরে এসেছে। দেখা গিয়েছে শুনানিতে নথি জমা দিয়ে উচ্ছ্বাসও।
উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া ১ ব্লক অফিসে মেয়ের সঙ্গে শুনানিতে এসেছিলেন বছর চুরাশির সুধীর দত্ত। বয়সজনিত রোগে ভুগছেন, লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন, কানেও শোনেন না। তাঁর মেয়ে পলি দত্তের ক্ষোভ, ‘‘অনেক কষ্টে বাবাকে শুনানিতে আনতেহয়েছে। এমন মানুষদের ক্ষেত্রে কেন বাড়িতে শুনানির ব্যবস্থা হবে না?” বনগাঁ মাদ্রাসায় ট্রাইসাইকেলে চেপে শুনানিতে আসেন বিশেষ ভাবে সক্ষম ৭৭ বছরের কালাচাঁদ মণ্ডল। গোপালনগরের বাসিন্দা কালাচাঁদ জানান, মঙ্গলবার শুনানিতে এসে কাগজপত্র সম্পূর্ণ না থাকায় ফিরে যেতে হয়। আবার এ দিন এসেছেন। তিনিও প্রশাসনের কাছে বাড়িতে শুনানির আবেদন জানান। বর্ধমান শহরের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের বৃদ্ধা মায়া কর্মকার এ দিন জেলাশাসকের দফতরের শুনানিকেন্দ্রে দীর্ঘ ক্ষণ অপেক্ষা করে, অসুস্থ হয়ে পড়েন।
পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের সামসাবাদে শুনানিতে হাজির বৃদ্ধ দম্পতিকে হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। ৭২ ছুঁইছুঁই গৌরী পট্টনায়ক কানে শুনতে পান না। ঠিকঠাক হাঁটাচলাও করতে পারেন না। তাঁর স্বামী অশোক পট্টনায়কের বয়স ৭৬। শুনানির নোটিস পেয়ে বৃদ্ধা স্বামীকে নিয়ে কষ্ট করে তিন তলায় উঠে নথি দেখালেও, তাঁদের হয়রান করা হয় বলে অভিযোগ। পূর্ব মেদিনীপুরে ৮৫ ঊর্ধ্বদের বাড়িতে গিয়ে শুনানি এ দিনও শুরু হয়নি। একই পরিস্থিতি নদিয়া, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ, আলিপুরদুয়ার, কালিম্পংয়ে।
শরীরে জলবসন্ত নিয়ে এ দিন নদিয়ার কৃষ্ণনগরের সিএমএস স্কুলের মাঠে শুনানিকেন্দ্রে হাজির হন শহরেরই বাসিন্দা শুক্লা ওরাওঁ। বলেন, “নির্বাচন কমিশন যে অসুস্থতার ক্ষেত্রে বাড়িতেই শুনানির ব্যবস্থা করতে বলেছে, তা কেউ বলেনি। না এলে যদি নাম কাটা যায়, সে ভয়েই এসেছি।” হাওড়ার বাগনান ১-এর ব্লকের রামচন্দ্রপুরের ৮৫ বছরের পারুলবালা জানাকে বাড়ি থেকেই প্রয়োজনীয় নথি দিতে বলেছিলেন বিএলও। তবে ব্লক অফিসে শুনানিতে হাজির হয়ে পারুল বললেন, ‘‘অন্যের হাতে কাগজ দিয়ে বিশ্বাস নেই। যদি কোনও ভুলে নাম বাদ চলে যায়! তাই নিজেই এলাম।’’
একই ধরনের উদ্বেগ থেকে এ দিন পেটে অস্ত্রোপচার হওয়ার পরে মল্লিকা কাহার নামে মাঝবয়সি এক ভোটার বীরভূমের বোলপুর ব্লক অফিসে হাজির হন অ্যাম্বুল্যান্সে। লাঠিতে ভর দিয়েআসেন পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের ৮৬ বছরের মায়ারানি গড়াই। ভাতারের নিত্যানন্দপুরের কাপশোর গ্রামের ৭৫ বছরের মোর্শেদ মল্লিকও অসুস্থতা নিয়েই হাজির হন। বিএলও দেলবাহার সুহানা বলেন, “বাড়ি গিয়ে শুনানি হবে, জানানো হয়েছিল। কিন্তু বাড়ির লোকজন নিয়ে এসেছেন।”
একাধিক জেলা প্রশাসনের কর্তাদের দাবি, ৮৫ বছরের ঊর্ধ্বে, অসুস্থ, বিশেষ ভাবে সক্ষম ভোটারেরা যাতে শুনানিকেন্দ্রে না আসেন, সে বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ আতঙ্কে শুনানিকেন্দ্রে চলে আসছেন। তবে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বীরভূম, উত্তর দিনাজপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, হুগলি, মুর্শিদাবাদ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাংশে বাড়ি গিয়ে শুনানি হয়েছে। হুগলির পুরশুড়ার মনিরা বেগম বলেন, ‘‘অসুস্থতার জন্য বাড়িতে শুনানির আবেদন করা হয়েছিল। সংশয় ছিল, আধিকারিকেরা আসবেন কি না। ওঁরা এসেছিলেন। খুব খুশি।’’
খুশি আরতি দে-ও। হাওড়ার উলুবেড়িয়া ১ ব্লক অফিসে শুনানি থেকে বেরিয়ে অপেক্ষারত নাতনিকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন বছর বাহাত্তরের বৃদ্ধা, “আর চিন্তা নেই। আমি যে দেশের নাগরিক, প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। আর কেউ দেশ থেকে তাড়াতে পারবে না।”