বিশ্বজিত্ মিত্র: কালিগঞ্জে মৃত কিশোরী তামান্নার (Kaligunj Tamanna Death Case) মায়ের শারীরিক (tamanna's mother's অবস্থার অবনতি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কলকাতা বেসরকারি হাসপাতালে। আজ নদীয়ার শান্তিপুরে নিয়ে যাওয়ার সময় পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে। গত দু'দিন আগে তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন। তারপর জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরের দিনই শক্তিনগর জেলা হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর গতকাল রাত্রি থেকে আবার ফিরে অসুস্থ বোধ করেন। পরিবার ও প্রতিবেশীরা তাকে কালীগঞ্জের বাড়ি থেকে তাকে চিকিত্সার জন্য নিয়ে যাচ্ছে কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালে।
প্রসঙ্গত, নদীয়ার কালীগঞ্জে উপনির্বাচনের বিজয় মিছিলে বোমাবাজিতে প্রাণ হারানো ১০ বছরের শিশু তামান্না শেখের পরিবারে শোকের ছায়া কাটেনি আজও। বরং দীর্ঘ সাত মাস পেরিয়ে গেলেও খুনিদের সবার শাস্তি না হওয়া এবং উল্টে দুষ্কৃতীদের লাগাতার হুমকিতে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছেন তামান্নার মা সাবিনা খাতুন। গত মঙ্গলবার রাতে মানসিক অবসাদ ও আতঙ্কে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য কলকাতার হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
কী ঘটেছিল গত ২৩শে জুন?
কালীগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীর জয় নিশ্চিত হতেই শাসকদলের বিজয় উৎসব শুরু হয়। অভিযোগ, সেই মিছিল থেকেই মোলান্দি গ্রামের সিপিএম সমর্থক পরিবারের বাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি বোমা ছোড়া হয়। বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তামান্না। বোমার আঘাতে নিথর হয়ে যায় শিশুটি। সেই সময় খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং পুলিশ ১০ জনকে গ্রেফতারও করে। কিন্তু তামান্নার পরিবারের দাবি, খুনের ঘটনায় জড়িত ২৪ জনের মধ্যে অনেকেই এখনও অধরা।
হুমকি ও বিচারহীনতার আতঙ্ক
তামান্নার বাবা হুসেন শেখের অভিযোগ, 'চোখের সামনে মেয়ের ছিন্নভিন্ন শরীর দেখার যন্ত্রণা সাবিনা আজও ভুলতে পারেনি। তার ওপর যারা এখনও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা আমাদের প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে। আমাকেও মেরে ফেলার ভয় দেখাচ্ছে। সন্তান হারিয়ে সাবিনা এখন আমার জীবন নিয়েও আতঙ্কে রয়েছে।'
পরিবারের দাবি, গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তরা জামিন পেয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে আবার হামলা করতে পারে—এই আশঙ্কাই কুরে কুরে খাচ্ছিল সাবিনাকে। পুলিসের তদন্তে নিষ্ক্রিয়তা এবং সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়ে হাই কোর্টে মামলা করলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীর গতি তাঁকে মানসিক অবসাদের চরম সীমায় ঠেলে দিয়েছে।
যন্ত্রণার চরম পরিণতি
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে নিজের ঘরে অচৈতন্য অবস্থায় পড়েছিলেন সাবিনা। পাশে পড়ে ছিল খালি ওষুধের পাতা। জানা গেছে, তিনি নিয়মিত অবসাদের ওষুধ খেতেন, কিন্তু ওই রাতে তিনি একসঙ্গে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেন। দ্রুত তাঁকে পলাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং পরে কৃষ্ণনগরের শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় এবং মানসিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে বৃহস্পতিবার কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
বিচারই কি একমাত্র মলম?
কালীগঞ্জের নবনির্বাচিত বিধায়ক আলিফা আহমেদ ঘটনাটিকে ‘মর্মান্তিক’ বললেও, নিহত শিশুর কাকা রবিউল শেখের সাফ কথা, “সব অভিযুক্ত ধরা না পড়া পর্যন্ত আমরা স্বস্তিতে নেই। দিদি (সাবিনা) মানসিকভাবে পুরো ভেঙে পড়েছেন। খুনিরা বুক ফুলিয়ে ঘুরছে, আর আমরা বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছি।”
সন্তান হারানোর ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার বদলে প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা এবং নিরাপত্তা হীনতা আজ নদিয়ার এক শোকার্ত মা-কে আত্মহননের পথে ঠেলে দিয়েছে। সাবিনা খাতুনের শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল হলেও, তাঁর মনের ক্ষত কি কখনও বিচার পেয়ে শুকোবে? এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।