• আরজি কর আন্দোলনে বড় ধাক্কা! 'জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট দুর্নীতিগ্রস্ত', ইস্তফা দিলেন 'বিদ্রোহের মুখ' অনিকেত মাহাতো...
    ২৪ ঘন্টা | ০২ জানুয়ারি ২০২৬
  • অয়ন শর্মা: আরজি কর আন্দোলনে ফাটল! ‘অভয়া’র ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অনাস্থা জানিয়ে জুনিয়র ডক্টর্‌স ফ্রন্ট ছাড়লেন অনিকেত মাহাতো।

    বছর শুরুর দিনেই আরজি কর আন্দোলনের অন্দরে জমায়েত হওয়া ক্ষোভ আর মতবিরোধ প্রকাশ্যে এল। পশ্চিমবঙ্গ জুনিয়র ডক্টর্‌স ফ্রন্টের বোর্ড অফ ট্রাস্ট থেকে ইস্তফা দিলেন চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো। বুধবার ট্রাস্টকে লেখা এক দীর্ঘ চিঠিতে তিনি তাঁর এই সিদ্ধান্তকে 'দুঃখজনক' হিসেবে বর্ণনা করলেও, সংগঠনের বর্তমান কার্যপদ্ধতিকে 'অগণতান্ত্রিক' বলে তোপ দেগেছেন।

    কী লিখেছেন তিনি চিঠিতে?

    প্রতি,

    বোর্ড অফ ট্রাস্ট

    ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট

    মহাশয়,

    অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আপনাদের জানাচ্ছি যে, শেষ পর্যন্ত আমাকে 'ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টে'র (WBJDF) বোর্ড অফ ট্রাস্ট থেকে এবং এই ট্রাস্টের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে হচ্ছে। এ ধরনের একটা বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত যে আমাকে নিতে হবে এর আগে আমি ভাবিনি।

    ট্রাস্ট এবং এক্সিকিউটিভ কমিটির সুনিদিষ্ট সম্পর্ক ঠিক না করে, আইনি পরামর্শ উপেক্ষা করে, যেভাবে এই কমিটি তৈরি করা হচ্ছে, সেটা আমি মনে করি সম্পূর্ণ অগনতান্ত্রিক এবং এর সাথে অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবিতে আন্দোলনও সংগতিপূর্ণ নয়। আমি এ বিষয়ে আমার আপত্তির কথা বারংবার জানিয়েছি, আইনি পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছি, তাতে আপনারা কর্ণপাত করেন নি।

    বিগত ৯ আগস্ট ২০২৪ আর জি কর মেডিকেল কলেজে অভয়ার মর্মান্তিক হত্যা ও ধর্ষণের প্রতিবাদে সমগ্র রাজ্য, দেশ, এমনকি দেশের বাইরেও যে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল তাকে পরিচালনা করতেই 'ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়ার ডক্টরস ফ্রন্ট' (WBJDF) তৈরি হয়েছিল। এই আন্দোলন চলাকালীন আন্দোলনের কর্মপন্থা নিয়ে আপনাদের সাথে আমার মাঝে মাঝে মতপার্থক্য যে হয়েছিল সেটা আপনারা জানেন। তবুও ঐক্য বজায় রেখে আমার সাধ্যমত আন্দোলনে ভূমিকা পালন করে গেছি- সেটা আপনারা জানেন, দেশবাসীও জানেন। কিন্তু রাজ্য সরকার যখন প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি অনিকেত মাহাতো, দেবাশীষ হালদার ও আসফাকুৱা নাইয়া-এই তিনজনের পোস্টিং বেআইনিভাবে পরিবর্তন করে দিল, তখন দুজন জয়েন করে গেলেও প্রতিবাদ স্বরূপ আমি পরিবর্তিত জায়গায় জয়েন না করে আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কলকাতা হাইকোটের সিঙ্গেল বেঞ্চ ও ডিসিশন বেঞ্চ আমার পক্ষে রায় দেওয়ার পর সরকার সুপ্রিম কোটে আপিল করেছিল। সুপ্রিম কোর্টও আমার পক্ষে রায় দেয় ও দু সপ্তাহের মধ্যে আর জি করে জয়েন করানোর নির্দেশ দেয়। দু সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত সরকার আমাকে জয়েন করতে দেয়নি। এ কথা আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সরকারের কাছে আমি মাথা নত করব না, শেষ পর্যন্ত সর্বপ্রকার লড়াই করে যাব।

    অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবিতে আন্দোলনে আমি প্রথম থেকেই যুক্ত হয়ে সাধ্যমত আমার ভূমিকা পালন করে গেছি, ভবিষ্যতেও আমি করে যাব।

    আশা করি আপনারা আমার এই পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করবেন।

    ধন্যবাদান্তে,

    অনিকেত মাহাতো

    ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

    সংঘাতের মূলে ‘অভয়া তহবিল’ ও অগণতান্ত্রিক পরিকাঠামো

    আরজি করের ঘটনার পর আইনি লড়াই চালানোর জন্য জুনিয়র ডক্টর্‌স ফ্রন্টের পক্ষ থেকে ‘অভয়া তহবিল’ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে এই তহবিলের অর্থের ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছিল। অনিকেতের অভিযোগ, সংগঠনের এগ্‌জ়িকিউটিভ কমিটি গঠন করার সময় ট্রাস্টের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট আইনি সম্পর্ক স্থির করা হয়নি। আইনি পরামর্শ উপেক্ষা করে যেভাবে ৩৭ সদস্যের কমিটি তৈরি করা হয়েছে, তা আদতে আন্দোলনের মূল আদর্শের পরিপন্থী।

    ইস্তফাপত্রে অনিকেত সাফ জানিয়েছেন, 'আইনি পরামর্শ উপেক্ষা করে ট্রাস্ট ও কমিটির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করা হয়েছে। বারবার আপত্তির কথা জানালেও কেউ কর্ণপাত করেনি। এই পদ্ধতি নির্যাতিতার জন্য ন্যায়বিচারের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।' তাঁর মতে, আন্দোলনের অভিমুখ বদলে যাচ্ছে এবং সংগঠনের ভেতরে একনায়কতন্ত্র জেঁকে বসেছে।

    বদলি বিতর্ক ও ব্যক্তিগত লড়াই

    আরজি কর আন্দোলনের প্রথম সারির মুখ হওয়ায় অনিকেত মাহাতো, দেবাশিস হালদার এবং আসফাকুল্লা নাইয়া সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ। প্রতিহিংসামূলকভাবে তাঁদের দূরে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। দেবাশিস ও আসফাকুল্লা পরবর্তীতে নতুন জায়গায় কাজে যোগ দিলেও অনিকেত তাঁর অধিকারের লড়াই চালিয়ে যান। সুপ্রিম কোর্ট আরজি কর হাসপাতালেই তাঁর পোস্টিংয়ের নির্দেশ দিলেও অভিযোগ, তাঁকে এখনও কাজে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। ফ্রন্টের ভেতরের অসহযোগিতা তাঁর এই ব্যক্তিগত লড়াইকেও কঠিন করে তুলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

    আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ও প্রতিক্রিয়া

    অনিকেতের এই প্রস্থান কি তবে আরজি কর আন্দোলনের ভিত নড়িয়ে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তরে অনিকেত আনন্দবাজার অনলাইনকে জানান, 'আমি কারও ওপর ক্ষুব্ধ নই। সাধারণ মানুষের টাকায় ফ্রন্ট তৈরি হয়েছে, তাই ফ্রন্ট কী করবে সেটা তারাই ঠিক করুক। তবে ভোটাভুটির আগেই আমি সরে এসেছি কারণ পদ্ধতিটি ঠিক ছিল না।'

    উল্লেখ্য, সিবিআই তদন্তের পর সঞ্জয় রায়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও নির্যাতিতার পরিবার ও আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের একাংশ মনে করেন, বৃহত্তর ষড়যন্ত্রকারী ও রাঘববোয়ালদের আড়াল করা হয়েছে। সেই লড়াই এখনও সুপ্রিম কোর্টে চলছে। এই জটিল সময়ে অনিকেতের মতো বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সরে যাওয়া ‘অভয়া’র ন্যায়বিচারের দাবিকে কতটা দুর্বল করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

    অনিকেতের এই পদত্যাগ কি ফ্রন্টের অন্যান্য সদস্যদেরও পদত্যাগে প্ররোচিত করবে, নাকি সংগঠনের অন্দরে সংস্কারের পথ প্রশস্ত করবে—সেদিকেই এখন নজর রাজ্যবাসীর।

     

     

  • Link to this news (২৪ ঘন্টা)