• ৫০০ বছর আগে এই শহরের মাটিতেই গুরু নানক, আজকের দিনেই আগমন, কঠিন মহামারীতে ১২ দিন সেবা কলকাতার
    বর্তমান | ০২ জানুয়ারি ২০২৬
  • কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: ‘চঞ্চল চীত ন পাবৈ পারা আবত জাত ন লাগত বারা।’ কার রচনা? ‘শিখদের প্রথম ধর্মগুরু গুরু নানকের।’ লেখা আছে ‘শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিবে।’ ১৫১০ সালের জানুয়ারি মাসে লিখেছিলেন নানক। এই কলকাতায়।

    হাওড়া ব্রিজের খানিক দূরে যেখানে এম জি রোড, সেখানে আসেন নানক। থাকেন। সেখানেই বসন্ত রাগে রচনা করেন ‘চঞ্চল চীত...’ বাণী। গ্রন্থ সাহিবের ১১৮৯ নম্বর পাতাটি খুললে পড়া যাবে।

    এখনকার কলকাতা আর নানকের সে কলকাতা কিন্তু মোটেও একরকম নয়। কলকাতা তখন গা ছমছমে জঙ্গলাকীর্ণ জলাভূমিপূর্ণ নির্জন জনপদ। বিশেষ করে গঙ্গার দিকটা। যখন তখন বাঘ বেরোয়। চিৎপুরে ডাকাতদের দৌরাত্ম্য। গঙ্গার ধার ঘেঁষে সরু একটি পায়েচলা পথ, পিলগ্রিম রোড-চিৎপুরের চিত্তেশ্বরী মন্দির থেকে কালীঘাট যুক্ত করেছে। তা দিয়ে কালেভদ্রে যাতায়াত করেন তীর্থযাত্রীরা।

    সেই কলকাতার এক পৌষ মাস। গঙ্গা থেকে বয়ে আসা হাওয়ায় কনকনে শীত ছড়িয়ে পড়ছে গাছপালার ফাঁক দিয়ে। সূর্যের আলো পড়ে লক্ষ হিরের মতো ঝকমক করছে গঙ্গা। দিনের দ্বিপ্রহর। নদীর পাড়ের রাস্তা ধরে হেঁটে আসছেন ৪১ বছরের সুদর্শন এক যুবা। দাড়ি-গোঁফ উড়ছে হাওয়ায়। আয়ত, তেজোদীপ্ত দৃষ্টি। পরিভ্রমণে বেরিয়েছেন। মক্কা থেকে বারাণসী, তিব্বত থেকে শ্রীলঙ্কা ঘুরছেন। ধর্মগুরুদের সঙ্গে ধর্মালোচনায় বসছেন। ঘুরতে ঘুরতে পূর্ব বাংলা। ২ জানুয়ারি পা রাখলেন কলকাতায়। এখানে তখন ভয়ঙ্কর মহামারী। যমে-মানুষে টানাটানি। নানক এসেই শুরু করলেন মানবসেবা। বহু মানুষ সুস্থ হলেন তাঁর ঐশ্বরিক স্পর্শে। কলকাতায় ছিলেন মাত্র ১২ দিন। তার মধ্যেই ‘চঞ্চল চীত...’ রচনা, অনুগামীদের সৎসঙ্গ শুরুর নির্দেশ। তারপর পুরীর উদ্দেশে রওনা।

    বঙ্গপ্রদেশ তখন শ্রীচৈতন্যের নামগানের জ্বরে থরথর করে কাঁপছে। অন্যদিকে নানকও হয়ে উঠছেন ভারতবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগুরু। তখনই শিখ সম্প্রদায়ের প্রথম ধর্মগুরু নানকের পদধূলিধন্য কলকাতার মাটি। এই ইতিহাস গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে শিখ সম্প্রদায়। অন্য সবাইও করে। ১৫১০ খ্রিস্টাব্দ। জোব চার্নকের কলকাতায় পা রাখতে ঢের দেরি। সুতানুটি, গোবিন্দপুর, কলকাতা-ভাগীরথীর তীরে থাকা ছোট তিনটি গ্রাম। আয়তন উত্তর-দক্ষিণে তিন মাইলের মতো। পূর্ব-পশ্চিমে মাইল খানেক। চিৎপুর-শোভাবাজার-বাগবাজার, হাটখোলা নিয়ে সুতানটি। বউবাজার, ধর্মতলা, জানবাজার নিয়ে কলকাতা গ্রাম। আর হেস্টিংস, ময়দান, ভবানীপুর নিয়ে গোবিন্দপুর। নানকের আসার কিছুকাল পরে নদীয়া জেলার অধীনে থাকা ছোটো পল্লিগ্রাম হিসেবে সেগুলি সরকারি নথিতে ঢুকবে। নবাবরা এসে বসবেন শাসকের চেয়ারে। তাঁদের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে সুতোর ব্যবসা করবেন এখানকার কিছু আদি বাসিন্দা।

    নানকের কলকাতা ছাড়ার প্রায় দেড়শো বছর পর ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে এখানে আসেন শিখদের নবম গুরু তেগ বাহাদুর। নানকের উপদেশ প্রচার করেন। দৈনিক সৎসঙ্গ ও লঙ্গর চালুর নির্দেশ দেন। স্থানীয় এক জমিদারের মালিকানাধীন ছিল জায়গাটি। তাঁদের থেকে এই জমি কিনে স্থাপন করেন ‘গুরুদ্বারা বড়া শিখ সঙ্গত’। প্রথমে ছোট আকারে, পরে অট্টালিকার চেহারা নেয় গুরুদ্বারা। বড়বাজার থানার কাছে, হাওড়া যাওয়ার পথে বাঁহাতে পড়ে বড়া সঙ্গ। অন্দরমহলে নানক ও তেগ বাহাদুরের আগমনের কথা বড় বড় অক্ষরে লেখা। গেলে গুরুদ্বারার মুখ্য গ্রন্থি (প্রধান পূজারি) দলজিৎ সিং বলবেন, ‘আবার আসবেন। এই পুণ্যস্থানে মাথা ঠেকিয়ে যাবেন।’ আর পরম স্নেহে বুঝিয়ে দেবেন ‘চঞ্চল চীত...’ বাণীর মর্মার্থ। তারপর ওড়না-আঁচল বা রুমালে মাথা ঢেকে মূল মন্দিরে ঢুকলে কেউ একজন যত্ন করে হাতে তুলে দেবেন প্রসাদ—উৎকৃষ্ট ঘিয়ে তৈরি হালুয়া।

    গুরু নানককে প্রণাম করে এম জি রোড রাজপথে নামার পর মনে গুনগুন করবে ‘চঞ্চল চীত ন পাবৈ পারা আবত জাত ন লাগত বারা।’ বাণীটি ততক্ষণে পুরো মুখস্ত। বাংলায় মোটামুটি তর্জমা করলে হবে—চঞ্চলমতি মানুষ নিজের লক্ষ্য খুঁজে পায় না, (মোক্ষের খোঁজে) বারবার শুধু যায় আসে...। 
  • Link to this news (বর্তমান)