জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: রাজ্য বার কাউন্সিল (West Bengal state Bar Council) নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়ম, ভোটার তালিকা থেকে বাদ খোদ মুখ্যমন্ত্রী, উত্তাল আইনজীবী মহল।
রাজ্য বার কাউন্সিলের নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই বিতর্কের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। স্বচ্ছতা আর নিরপেক্ষতা যেখানে নির্বাচনের মূল স্তম্ভ হওয়ার কথা, সেখানে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগে বিদ্ধ বর্তমান বিদায়ী বোর্ড। পরিস্থিতি এতটাই নজিরবিহীন যে, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। বাদ গিয়েছেন সাংসদ সৌগত রায় এবং বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রথিতযশা আইনজীবীরাও। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু রাজনৈতিক তরজা নয়, বরং গোটা রাজ্যের আইনজীবী মহলে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী ও হেভিওয়েটদের নাম গায়েব: স্তম্ভিত বার অ্যাসোসিয়েশন
আইনজীবী মহলের একাংশের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের দীর্ঘদিনের সদস্য। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যও সক্রিয় আইনজীবী হিসেবে বারের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকায় না থাকা কোনো সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি হতে পারে না বলেই মনে করছেন তৃণমূলপন্থী আইনজীবীরা। অভিযোগ উঠেছে, বিদায়ী বোর্ড সুপরিকল্পিতভাবে প্রভাব খাটানোর জন্য এই তালিকা তৈরি করেছে। এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে শাসকদলের লিগ্যাল সেল এখন বার কাউন্সিলের বিদায়ী বোর্ডের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও শানিত করছে।
ভোটার তালিকায় ব্যাপক গরমিল: সংখ্যাতত্ত্বের লড়াই
সূত্রের খবর অনুযায়ী, ২০১৮ সালের শেষ বার কাউন্সিল নির্বাচনে প্রায় ৩০ হাজার আইনজীবী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন। দীর্ঘ কয়েক বছর পর বর্তমানে প্রকাশিত নতুন খসড়া তালিকাতেও ভোটারের সংখ্যা সেই ৩০ হাজারেই থমকে রয়েছে। আইনজীবীদের হিসেব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে কয়েক হাজার নবীন আইনজীবী আইন পাশ করে কাউন্সিলের সার্টিফিকেট নিয়ে বিভিন্ন আদালতে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। স্বাভাবিক নিয়মেই ভোটারের সংখ্যা অন্তত ৫৫ হাজার হওয়া উচিত ছিল। অথচ দেখা যাচ্ছে, নতুনদের নাম তো ওঠেইনি, উল্টে পুরনো তালিকা থেকে প্রায় ১৭ থেকে ২০ হাজার বৈধ ভোটারের নাম কোনও কারণ ছাড়াই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য লিগ্যাল সেলের প্রাক্তন আহ্বায়ক তরুণ চট্টোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ করেছেন, 'জেলায় জেলায় সাধারণ আইনজীবী থেকে শুরু করে বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামও তালিকায় নেই। কাউন্সিলের কিছু সদস্য অত্যন্ত হিসেব কষে এমনভাবে এগোচ্ছেন যাতে নতুন ও নিরপেক্ষ আইনজীবীরা ভোট দিতে না পারেন। কিন্তু এই চক্রান্ত সফল হতে দেবেন না সাধারণ আইনজীবীরা।'
আইনজীবী সুবীর সেনগুপ্ত দীর্ঘদিন ধরেই বার কাউন্সিলের অনেক অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়ছেন। বার কাউন্সিল অন্যায়ভাবে আইনজীবাদের কাছ থেকে মেম্বারশিপের টাকা নেয়, কিন্তু তা আসল জায়গায় পৌঁছয় না। দিন দিন আইনজীবিদের কাছ থেকে বেশি বেশি ফিজ নিচ্ছে, কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম থাকছে না। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট অবধি গিয়েছেন তিনি। এছাড়া, জুনিয়র আইনজীবীদের ফিজ নিয়েও তীব্র বৈষম্য। সব মিলিয়ে বার কাউন্সিলের নির্বাচন নিয়ে তুমুল অশান্তি।
বিতর্কের কেন্দ্রে ‘সার্টিফিকেট অফ প্র্যাক্টিস’ (COP)
বার কাউন্সিলের নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ‘সার্টিফিকেট অফ প্র্যাক্টিস’। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশানুসারে, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নিজেদের ওকালতি পেশাকে বৈধ হিসেবে চিহ্নিত করতে এই শংসাপত্র সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক। বর্ষীয়ান আইনজীবীদের অভিযোগ, ২০১৬ সালে এই শংসাপত্র দেওয়ার নামে বার কাউন্সিল ৩০০ টাকা করে নিলেও দীর্ঘ সময় ধরে কাউকে কোনো সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়নি।
আইন অনুযায়ী, এই সার্টিফিকেট না থাকলে কোনো আইনজীবীর ভোটার হওয়ার বা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা থাকে না। অথচ দেখা যাচ্ছে, বর্তমান নির্বাচনে যাঁরা প্রার্থী হচ্ছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই এই বৈধ শংসাপত্র নেই। এই দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীদের একটি বড় অংশ। এমনকি বর্তমান চেয়ারম্যান অশোক দেবের নাম তালিকায় থাকা নিয়েও কটাক্ষ করেছেন বিরোধীরা। তাঁদের প্রশ্ন, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী ও প্রবীণ আইনজীবীদের নাম বাদ যায়, সেখানে নিয়মিত প্র্যাকটিস না করেও চেয়ারম্যানের নাম কীভাবে বহাল থাকে?
আদালতের দ্বারস্থ আইনজীবীরা: নজর ৭ই জানুয়ারির দিকে
নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং খসড়া তালিকা সংশোধনের দাবিতে ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। গত শুক্রবার বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল, বিজেপি ও কংগ্রেসপন্থী আইনজীবীরা। শাসক-বিরোধী উভয় পক্ষের আইনজীবীরাই একসুরে জানিয়েছেন, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়।
বিচারপতি কৃষ্ণা রাও মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে, আগামী ৭ই জানুয়ারি এই মামলার শুনানি হবে। আইনজীবীদের দাবি, অন্তত ২০ হাজার আইনজীবীর নাম কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়েছে। ১৯, ২০ ও ২১শে ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত তারিখের আগে এই জটিলতা না কাটলে ভোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
তদারকিতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও সুপ্রিম নির্দেশ
শীর্ষ আদালত আগেই নির্দেশ দিয়েছিল যে, আগামী বছরের মার্চের মধ্যে বাংলায় বার কাউন্সিলের নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচনের তদারকির জন্য সুপ্রিম কোর্টের উচ্চপর্যায়ের কমিটি মণিপুর হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ডি কৃষ্ণকুমার এবং কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়কে দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেছে। যদিও বিচারপতি রায় এখনও সরকারিভাবে নিজের সম্মতির কথা জানাননি।
প্রতিবাদের সুর জেলায় জেলায়
অনিয়মের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যের প্রায় সব জেলা আইনজীবী সংগঠন ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তারা ইতিমধ্যেই বার কাউন্সিলকে চিঠি দিয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানিয়েছে। শুক্রবার বার কাউন্সিলের অফিস খোলার পর সেখানে বিভিন্ন জেলার আইনজীবীরা গিয়ে বিক্ষোভ দেখানোর পরিকল্পনা করছেন।
অন্যদিকে, বার কাউন্সিলের সহকারী সম্পাদক পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “ভোটার তালিকায় নাম তোলার সময়সীমা বাড়ানো হবে কি না, তা যথাসময়ে জানানো হবে। কোনো অভিযোগ বা প্রশ্ন থাকলে আইনজীবীরা সরাসরি কাউন্সিলের অফিসে এসে কথা বলতে পারেন।”
লড়াই এখন অস্তিত্বের
রাজ্য বার কাউন্সিলের এই নির্বাচন কেবল কে জিতবে বা কে হারবে—সেই লড়াই নয়, বরং এটি আইনি পেশার স্বচ্ছতা ও মর্যাদার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনোনয়ন খরচ ৩০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্তও সাধারণ আইনজীবীদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেখার, ৭ই জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্ট কী নির্দেশ দেয়। সংশোধন কি হবে? নাকি ত্রুটিপূর্ণ এই তালিকা নিয়েই হবে নির্বাচন? উত্তর দেবে আদালত।