২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ৩১টি আসনের মধ্যে তৃণমূলের ঝুলিতে এসেছিল ৩০টি আসন। ভাঙড় আসনটি গিয়েছিল ISF-এর ঝুলিতে। কিন্তু ’২১-এর সেই ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ’২৬-এ তিনি যে কোনও মতেই চান না, শুক্রবার বারুইপুর পূর্বের জনসভা থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার ফুলতলা সাগরসঙ্ঘের মাঠে জনসভা করেন তিনি। সেখানেই বলেন, ‘এ বার ভাঙড়ও আমাদের জিততে হবে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা ৩১-এ ৩১ করতে হবে। তার জন্য যত পরিশ্রম করা প্রয়োজন, তা করতে হবে।’ তাঁর সাফ নির্দেশ, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোনও আসনে প্রতিপক্ষের সঙ্গে জয়ের ব্যবধান যেন ৫০ হাজারের থেকে না কমে।
এ দিনের সভার মাধ্যমে জেলায় জেলায় নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দিলেন অভিষেক। কিন্তু কেন তিনি প্রথমেই বেছে নিয়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনাকে? সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কালীঘাট আমার জন্মভূমি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা আমার কর্মভূমি। এখানে সকলের আশীর্বাদ নিয়ে এই লড়াই শুরু করছি।’ দক্ষিণ ২৪ পরগনা বরাবর তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। তিন বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলার মসনদে বসানোর নেপথ্যে এই জেলার বিশেষ অবদান রয়েছে, সে কথাও এ দিন উল্লেখ করেন অভিষেক।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের কথায়, ভাঙড় যে ’২৬-এ তৃণমূলের ‘পাখির চোখ’ হতে চলেছে, তা এ দিনের সভা থেকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ এ দিন বলেন, ‘২০২১ সালে তৃণমূল জিতেছিল ২১৪টি আসনে। এ বার একটি হলেও আসন বাড়বে। আর সেই একটি আসন যেন এ জেলা থেকে হয়। এ বার ভাঙড়ও আমাদের জিততে হবে। ৩১-এ ৩১ করতে হবে দক্ষিণ ২৪ পরগনায়।’ সে জন্য যে কঠোর পরিশ্রমও করতে হবে—সে ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রয়োজনীয় সমস্ত জায়গায় গিয়ে সভা করতে রাজি, সে কথাও জানিয়ে দিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ।
কিছুদিন আগেই বঙ্গ সফরে এসে নির্বাচনী প্রচারের অঘোষিত সূচনা করে গিয়েছেন অমিত শাহ। তিনি ‘সোনার বাংলা’ গড়ার কথা বলেছিলেন। আর শাহের সেই বক্তব্যের রেশ টেনেই এ দিন পাল্টা অভিষেক বলেন, ‘ত্রিপুরা, অসম, বিহার সোনার রাজ্য হচ্ছে না কেন? মধ্যপ্রদেশে পানীয় জল পান করে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পানীয় জল কোনও মানুষের ন্যূনতম চাহিদা। যে বিজেপি সরকার তা দিতে পারে না, তাদের গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলার অধিকার নেই।’
এ দিন শাহের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও নিশানা করেছেন অভিষেক। চাকরি নিয়ে কথা রাখেননি মোদী, দাবি তাঁর। তৃণমূল সাংসদ বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার সময়ে বছরে ২ কোটি চাকরি দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সে ক্ষেত্রে ১১ বছরে ২২ কোটি চাকরি দেওয়ার কথা। দেশে ৪ হাজার ১২৩টি বিধানসভার কেন্দ্র রয়েছে। ২ কোটি চাকরি ভাগ করা হলে প্রতিটি বিধানসভা পিছু ৫৩ হাজারের চাকরি পাওয়ার কথা। নরেন্দ্র মোদী সরকার যদি প্রমাণ করতে পারে একটি বিধানসভাতেও পাঁচ হাজার চাকরি দিয়েছে, তা হলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেবো।’
সম্প্রতি বঙ্গ বিজেপির প্রথম সারির নেতারা নিজেদের মন্তব্যে একাধিক বার উল্লেখ করেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বঙ্গে চালু থাকা সব জনকল্যাণমূলক প্রকল্প সচল থাকবে। গত ৩০ ডিসেম্বর রাজ্যে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও আশ্বাস দিয়েছিলেন, বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় এলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের চালু করা একটি প্রকল্পও বন্ধ হবে না। উল্টে তার সঙ্গে আরও কিছু নতুন প্রকল্প তালিকায় জুড়বে। এ বার শাহের সেই দাবির পাল্টা তোপ অভিষেকের। তিনি দাবি করেন, বিজেপি শাসিত একটি রাজ্যেও যদি বাংলার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের মতো মহিলাদের ১ হাজার টাকা করে মাসে দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। মহারাষ্ট্রে মহিলাদের টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেও ভেরিফিকেশনের নামে ৬০-৭০ লক্ষ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও তোপ অভিষেকের।
এ দিনের মঞ্চ থেকে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজের অডিয়ো শোনান অভিষেক। অডিয়ো ক্লিপে শুভেন্দুকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘এটা সরকার চলছে? এর থেকে তো ইউনূসের সরকার ভালো চলছে বাংলাদেশে।’ অভিষেকের তোপ, ‘বাংলাদেশে দীপু দাসের নির্মম হত্যার কথা সামনে এসেছে। বিজেপির নেতা, যাঁর নেতৃত্বে হিন্দুদের মারা হচ্ছে, তাঁকে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন।’ অন্য একটি অডিয়োয় অনন্ত মহারাজ ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতিকে পাকিস্তানি এবং প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশি বলেছেন, অভিযোগ করেন অভিষেক।
ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, ভোট যত এগিয়ে আসছে, প্রতিটি দলই রাজনৈতিক আক্রমণে সুর আরও ঝাঁঝালো করছে। গত বিধানসভা ভোটের থেকে কমপক্ষে একটি হলেও আসন বৃদ্ধি তৃণমূলের লক্ষ্য, তা অভিষেকের মন্তব্যেই স্পষ্ট, মনে করছে তারা।