অয়ন শর্মা: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও এখনও আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে পোস্টিং পাননি অনিকেত মাহাতো। তাই এ বার এসআর-শিপ (সিনিয়র রেসিডেন্ট) পোস্টিং ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠক করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান অনিকেত। তাঁর কথায়, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে আমার ডাক্তারি জীবনকে খুন করতে চায় রাজ্য সরকার।' এসআর-শিপ পোস্টিং ছাড়লে সরকারকে মোটা টাকা দিতে হয়। সেই টাকার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে সাহায্য চাইলেন অনিকেত।
আর এই নিয়েই শুক্রবার, সামবাদিক সম্মেলন করে জানালেন 'বিদ্রোহী' অনিকেত। জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট থেকে ইস্তফার পর এবার এসআরশিপ (সিনিয়র রেসিডেন্সি)-ও ছাড়ছেন আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ।
সাংবাদিক বৈঠক করে শুক্রবার অনিকেত বলেন, '৯ অগস্ট থেকে লড়াই শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সেই লড়াই সমর্থন করেছিল। লড়াইয়ের জন্যই সন্দীপ ঘোষ, আশিস পান্ডেরা জেলে। আমাদের দাবি মেনে তত্কালীন সিপি সহ বেশ কিছু আধিকারিককে অপসারণও করা হয়। আমি মুখ্যমন্ত্রীর সামনে কিছু বক্তব্য রাখি, তাতে ক্ষুব্ধ হন। পরবর্তীকালে মেরিটের বাইরে গিয়ে আমার বদলি করা হয়। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তা করা হয়। এরপর হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ অর্ডার দেয়। ডিভিশন বেঞ্চও একই নির্দেশে দেয়। সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়। সুপ্রিম কোর্টও বলে, ১৪ দিনের মধ্যে পোস্টিং দিতে হবে। কিন্তু তারপরেও এখনও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চলছে। এখনও পোস্টিং অর্ডার পাইনি। আরজিকরে পোস্টিং দেওয়া হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশও অমান্য করা হচ্ছে।'
অনিকেতের দাবি, 'আন্দোলন করলেই, যারা থ্রেট কালচার, দুর্নীতি, তদন্তে গাফিলতি নিয়ে কথা বলবে, তাদের সঙ্গেই এভাবে ব্যবহার করা হবে।" এরপরই অনিকেত সিনিয়র রেসিডেন্সিয়ালশিপ ছাড়ার কথা ঘোষণা করেন। অনিকেত তোপ দাগেন, " দীর্ঘ ৮ মাস ধরে আমার ডাক্তারি জীবনকে সরকার মার্ডার করছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই সরকারের আমলে এসআরশিপ (সিনিয়র রেসিডেন্সি) করা থেকে সরে আসব। কারণ তাদের আমলে কাজ করতে পারব না। তাই এসআরশিপ পোস্টিং জায়গা থেকে সরে আসছি।'
আর তারপরই, জুনিয়র ডাক্তার ফ্রন্টের তরফ থেকে লিখিত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় অনিকেত মাহাতোকে উদ্দেশ্য করে। ওই লিখিত বয়ানে জানানো হয় অনিকেত সর্বৈব মিথ্যাচার করেছে।
ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টর ফ্রন্ট এর তরফ থেকে ডাক্তার অনিকেত মাহাতো কে দেওয়া চিঠিতে যে বিষয় গুলো উল্লেখ করা হয়েছে......
১. 'রাজ্য সরকার যখন প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি অনিকেত মাহাতো, দেবাশীষ হালদার ও আসফাকুল্লা নাইয়া-এই তিনজনের পোস্টিং বেআইনিভাবে পরিবর্তন করে দিল, তখন দুজন জয়েন করে গেলেও প্রতিবাদ স্বরূপ আমি পরিবর্তিত জায়গায় জয়েন না করে আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম-' এই বাক্যটি সর্বৈব মিথ্যা ও অসৎ। আপনার সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের কাঙ্ক্ষিত ও মেধার ভিত্তিতে অর্জিত জায়গা থেকে বহু দূরে পোস্টিং পেয়েও 'এই বিপ্লবী ডাক্তাররা গ্রামে যেতে চায়না' এই মিথ্যা ন্যারেটিভকে ভাঙার জন্য নেওয়া সম্মিলিত সিদ্ধান্ত তো আপনার অজানা নয়, তাঁদের আইনি লড়াইকে যেমন আপনি উহ্য রেখেছেন, তাদের প্রতিবাদকে আপনি সরকারের সঙ্গে আপস বলেছেন এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তকে বিকৃতভাবে প্রকাশ করে ব্যক্তিগরিমার প্রচারের কাজে ব্যবহার করেছেন। জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য ছাড়া আমরা এই কথাগুলির অন্য কোনও অর্থ খুঁজে পাচ্ছিনা। আপনাকে এই কথাগুলির স্পষ্ট কারণ দর্শাতে হবে ও অন্যথায় ক্ষমা চাইতে হবে।
২.আমরা যারা অভয়ার ন্যায়বিচার চেয়ে আর তার এই নির্মম পরিণতির জন্য দায়ী শাসকের মদতে কলেজে কলেজে তৈরী হওয়া 'থ্রেট কালচার'-এর বিষবাষ্পকে উপড়ে ফেলতে পথে নেমেছিলাম তারা সবাই আপনার এই হঠকারী, ব্যক্তিস্বার্থসর্বস্ব ও অবিবেচক সিদ্ধান্তে অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত।
৩. অগণতান্ত্রিক ট্রাস্ট বডিকে ভেঙে গণতান্ত্রিক WBJDF গঠনের দিকে প্রাথমিক পদক্ষেপ আমরা নিচ্ছিলাম। সেই ভিত্তিতে WBJDF-এর অধুনা নিষ্ক্রিয় Whatsapp গ্রুপ গুলিতে আলোচনা ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য 'Executive body' তৈরীর আবেদন জানিয়ে আহ্বান করা হয় এবং তার ভিত্তিতে তৈরী হওয়া গ্রুপে যথাযথ স্বচ্ছতার সাথে কী ভাবে গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশ করা যায় সেই নিয়ে আলোচনা হয় এবং সেখান থেকেই অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে আপনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং প্রায় সবক্ষেত্রেই সম্মত ছিলেন। তাহলে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া এগনোর সময় কী এমন হল যে, আলোচনার উর্দ্ধে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে আপনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন?
৪. জনসমাজে আমাদের পরিচিতি তৈরী হয়েছে শাসকের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের সাথে সাথে বহু মত, মতাদর্শ ও মতানৈক্যকে ধারণ করেও একসাথে চলার নীতি দিয়ে। এই কথা কারও অজানা নয় এবং আপনি তো অবশ্যই জানেন কারণ, ২০২৪ এর সেপ্টেম্বর মাসেই আন্দোলনকে আদালতের হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়ার মতামত থেকে শুরু করে একদম হালফিলের এক্সিকিউটিভ বডির নির্বাচনের পক্ষে ভোট দিয়েও অকস্মাৎ সেই নির্বাচনকেই কারণ হিসেবে দেখিয়ে আপনার ট্রাস্টি পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার চিঠি দেখে বহুবার আপনার সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া । মতানৈক্যের আরও ভুরি ভুরি নিদর্শন পেশ করাই যায় কিন্তু সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে পারস্পরিক আলোচনা ও তর্কের অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে দিয়ে চালনা না করে জনসমক্ষে পেশ করার মতো নিম্নরুচি ও রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার পর্যায়ে WBJDF এখনও পৌঁছায়নি তাই আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
অনিকেতের পোস্টিং নিয়ে রাজ্যের সিদ্ধান্ত গত সেপ্টেম্বর মাসেই খারিজ করে দিয়েছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু। তিনি জানিয়েছিলেন, রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ নয়, আরজি করেই পোস্টিং দিতে হবে অনিকেতকে। সিঙ্গল বেঞ্চের রায়ে রাজ্য সন্তুষ্ট ছিল না। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যায় রাজ্য। কিন্তু বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চও সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ বহাল রাখে। সব শেষে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য। তবে শীর্ষ আদালতও বহাল রাখে হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়। তবে তার পরেও, এখনও পোস্টিং দেওয়া হয়নি অনিকেতকে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন)