• মনোলগ নয়, খোলা মঞ্চে জনতার দরবারে অভিষেক
    এই সময় | ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: রাজনৈতিক জনসভায় নেতাদের একতরফা ভাষণের গতানুগতিক রীতি ভেঙে জনতার নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নতুন ট্রেন্ড তৈরি করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। জনসভায় নেতাদের জনতার সামনে ‘মনোলগে’র ট্রাডিশন ভেঙে শনিবার চা–বলয়ের মানুষের সঙ্গে ‘ডায়লগে’র পথে হাঁটলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক।

    এই ‘ডায়লগে’র দরজা খুলে দিয়েই অভিষেক আলিপুরদুয়ারে জনতার একের পর এক প্রশ্নের উত্তরে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দেন। দিয়েছেন চা বাগানের সমস্ত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক, অ্যাম্বুল্যান্স রাখার আশ্বাসও। যে চা শ্রমিকদের পিএফ জমা পড়ছে না, তাঁদের দাবি নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা থেকে বিদেশে কর্মরত ব্যক্তি কী ভাবে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়ার (সার) শুনানিতে নথি জমা দেবেন, সেই পন্থাও ব্যাখ্যা করেন তিনি। এমনকী রাজ্য সরকারের ‘রূপশ্রী’ প্রকল্পে আবেদন করেও টাকা না পাওয়া এক মহিলা যাতে দ্রুত সেই টাকা পান, সেই আশ্বাসও দিয়েছেন অভিষেক।

    আলিপুরদুয়ারে মাঝেরডাবরি চা বাগানের পাশে তৃণমূলের জনসভায় প্রায় ৩৮ মিনিট ধরে চলা এই প্রশ্নোত্তর পর্বের একেবারে শেষে যে ড্রপ–বক্সের মধ্যে জনতার লিখিত প্রশ্ন রাখা ছিল, সেখানেই একটি প্রশ্ন অভিষেকের নজরে আসে। অভিষেক বলেন, ‘এখানে একজনের প্রশ্ন দেখছি, তিনি লিখেছেন, আমি বিয়ের জন্য টাকা পাচ্ছি না। যিনি লিখেছেন, তাঁর নাম মিক নাগাশিয়া। আপনি কোথায়? বিয়ের টাকা যিনি পাচ্ছেন না?’

    অভিষেকের এই প্রশ্ন শুনেই জনতার মধ্যে থেকে মিক নাগাশিয়া উঠে দাঁড়ান। অভিষেক জানতে চান, ‘বিয়ের টাকার জন্য কোথায় আবেদন করেছিলেন?’ নাগাশিয়া জানান, তিনি জেলাশাসকের দপ্তরে আবেদনপত্র জমা দিয়েও টাকা পাননি। অভিষেক তখন বলেন, ‘আপনার বিয়ে হয়ে গিয়েছে?’ ওই মহিলা মাথা নেড়ে জানান তাঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। নাগাশিয়ার জবাবে অভিষেক বলেন, ‘ওই আবেদনপত্রের একটি ছবি আমাকে পাঠান। আমি নিশ্চিত করব আপনি যাতে টাকা পান। আপনাকে শাদি মুবারক জানাই।’ অভিষেকের এই আশ্বাসে তুমুল হাততালি দেয় জনতা।

    আলিপুরদুয়ারের এই জনসভায় জনতা যাতে তাঁদের অভাব, অভিযোগের কথা অভিষেককে জানাতে পারেন তার জন্য তৃণমূলের পক্ষ থেকে আগাম একটি ফর্ম এ দিন ময়দানে জনতা আসতে শুরু করতেই তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ‘আবার জিতবে বাংলা’ স্লোগান লেখা সেই ফর্মে নাম, জেলা, বিধানসভা কেন্দ্র, মোবাইল নাম্বার উল্লেখ করে যে কেউ তাঁর সমস্যার কথা জানাতে পারবেন বলে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ প্রকাশ চিক বরাইক মাইকে ঘোষণা করেন। এই ফর্ম পূরণ করে জমা দেওয়ার জন্য ছ’টি ড্রপ–বক্স রাখা হয়েছিল।

    অভিষেক তাঁর ভাষণের মাঝপর্বে গিয়ে বলেন, ‘আমি একতরফা বলে চলে যাব তা নয়। আপনাদের যদি কোনও প্রশ্ন থাকে আপনারা তা করবেন। আপনাদের কথা শুনব। আমার যতটা সামর্থ্য, যতটা এক্তিয়ার রয়েছে, কাজ করার যে সুযোগ রয়েছে, তার মধ্যে থেকে চেষ্টা করব সমস্যার সমাধান করতে।’ আলিপুরদুয়ারের তৃণমূলের এক নেতা সেই ড্রপ–বক্স থেকে একের পর এক প্রশ্ন তুলে পড়তে শুরু করেন। যিনি প্রশ্ন করেছেন কখনও তাঁকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে, কখনও সমাবেশের মধ্যে কোথায় তিনি বসে রয়েছেন তা দেখে নিয়ে অভিষেক উত্তর দিতে শুরু করেন। এই প্রশ্নোত্তর পর্বেই কুমারগ্রামের রাজেশ ওরাওঁ চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য আর্জি জানান।

    রাজেশের আর্জির সঙ্গে সহমত পোষণ করে অভিষেক বলেন, ‘আমি একমত যে ২৫০ টাকায় সংসার চালানো সম্ভব নয়। চতুর্থবার তৃণমূলের সরকার গঠিত হওয়ার একমাসের মধ্যে সরকারি প্রতিনিধি, শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি এবং চা বাগান ম্যানেজমেন্টের প্রতিনিধিকে নিয়ে একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হবে। আমি নিশ্চিত করব যাতে, আপনাদের দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়।’

    চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের পড়ুয়াদের স্কুলে যাতায়াতের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমোদনে বাস কেনা হলেও সেই বাস এখনও রাস্তায় নামেনি। এই বিষয়টি জানতে পেরে সোমবার থেকে আলিপুরদুয়ার জেলায় পাঁচটি বাস পরিষেবা শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন অভিষেক।

    কোহিনূর চা বাগানের সঙ্গীতা ওরাওঁ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এই চা বাগানে শিশুদের জন্য ক্রেশ চালু হওয়ার কথা থাকলেও এখনও চালু হয়নি। আমার জা কন্যাসন্তানকে পিঠে নিয়ে চা পাতা তুলতে যায়।’ উত্তরবঙ্গের চা–বলয়ে অভিষেকের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজ্য সরকাররে তরফে চা বাগানে ক্রেশ চালু করা শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনও অনেক চা–বাগানে ক্রেশ চালু হয়নি। সঙ্গীতার সমস্যার কথা শুনেই অভিষেক বলেন, ‘মোট ৯০–৯৫টি ক্রেশ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে, ৩৪টি চালু হয়েছে। বাকিগুলি ছ’মাসে চালু হয়ে যাবে। আমি শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছি, প্রয়োজনে এক সপ্তাহের মধ্যে শ্রমমন্ত্রীকে এখানে পাঠাব। চা বাগানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে যে সমস্যা রয়েছে তার সমাধান করা হবে।’

    রীতা তেরওয়া জানতে চান, দুবাইয়ে কর্মরত তাঁর পরিজন কী ভাবে ‘সার’ শুনানিতে উপস্থিত হবেন। অভিষেক বলেন, ‘কেউ যদি ভিসা নিয়ে বিদেশে কাজ করেন, তাঁকে ফর্ম–৬ (এ) পূরণ করে ভিসা ও পাসপোর্টের কপি ইআরও অথবা ডিইও–র কাছে ই–মেল করে পাঠাতে হবে। বিএলও নাম কেটে দিতে পারেন না।’

    অভিষেক যাতে এই ভাবে জনতার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন, ‘মনোলগে’র বদলে ‘ডায়লগে’র পরিবেশ তৈরি হয়, সেই লক্ষ্যে মাঝেরডাবড়িতে চার দিক খোলা স্টেজ তৈরি করা হয়েছিল। সেই স্টেজের সঙ্গে চার দিকে চারটি লম্বা র‌্যাম্পও রাখা ছিল। র‌্যাম্পের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে অভিষেক জনতার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। যদিও খোলা মঞ্চে জনতার প্রশ্নের উত্তরে অভিষেকের প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘এই সব সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। চা–বাগানের জমিতে রিসর্ট তৈরি হচ্ছে। মদের দোকান তৈরি হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার লাইসেন্স দিচ্ছে। চা শ্রমিকরা শেষ হয়ে যাচ্ছেন। এখন ভোটের সময়ে এই সব করে কোনও লাভ নেই।’

  • Link to this news (এই সময়)