পড়ুয়া শূন্য, খটিয়ালবসান প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকদের আড্ডা দেওয়াই এখন ডিউটি
বর্তমান | ০৫ জানুয়ারি ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: দোতলা স্কুল বিল্ডিংয়ে রয়েছে চারটি ক্লাসরুম। প্রধান শিক্ষক সহ দু’জন শিক্ষক আছেন। অথচ, তমলুক থানার খটিয়ালবসান প্রাইমারি স্কুলে একজন পড়ুয়াও নেই। ২০২৫ সেশন পুরোটাই ছাত্রশূন্য অবস্থায় কেটেছে। ২০২৬সেশনেও ছাত্র ভর্তি করাতে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষ। ফলস্বরূপ পড়ুয়াশূন্য স্কুলে শিক্ষকদের আসা-যাওয়া এবং আড্ডা দেওয়া ছাড়া কোনও কাজ নেই। ২জানুয়ারি থেকে নতুন সেশনের ক্লাস শুরু হয়েছে। বিভিন্ন স্কুলে পড়ুয়াদের হাতে বই তুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ, খটিয়ালবসানের ওই প্রাইমারি স্কুলে পড়ুয়া না থাকায় প্রধান শিক্ষক অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক অফিস থেকে কোনও বইপত্র সংগ্রহ করেননি।
তমলুক শহরের রাধাবল্লভপুর থেকে রূপনারায়ণ নদ যাওয়ার রাস্তা বরাবর এগোলে বাঁদিকে পড়ে খটিয়ালবসান গ্রাম। শহর সংলগ্ন গ্রামটি শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের ধলহরা গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে পড়ে। ১৯৮১ সালে প্রাইমারি স্কুলটি তৈরি হয়। স্কুলে প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ দাস এবং সহকারী শিক্ষক প্রতুল হেমব্রম আছেন। প্রতুলবাবু বিএলও হিসেবে নিযুক্ত হওয়ায় আপাতত প্রধান শিক্ষক একা স্কুলে যাচ্ছেন। কয়েক বছর আগেও স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ২০জনের বেশি ছিল। ধীরে ধীরে কমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে তা সাতজন হয়। ২০২৫ সালের ৭জানুয়ারি নাগাদ একদিনে সাত পড়ুয়া স্কুল ছাড়ে। তারা নিকটবর্তী একটি প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি হয়। অভিভাবকদের অনেকেই বলছেন, শিক্ষকরা ঠিকমতো নিজেদের দায়িত্ব পালন করতেন না। তাই অভিভাবকরা একসঙ্গে সব পড়ুয়াকে অন্যত্র নিয়ে গিয়েছেন। স্কুল পড়ুয়াশূন্য হওয়ায় ২০২৫ সালের জুন মাসে জেলা বিদ্যালয় সংসদ সভাপতি হাবিবুর রহমান দুই শিক্ষককে নিজের অফিসে তলব করেন। অন্তত ২০জন পড়ুয়া ভর্তি করাতে না পারলে দু’জনকেই দূরবর্তী স্কুলে বদলি করার হুঁশিয়ারি দেন। সেই হুঁশিয়ারিতেও কোনও কাজ হয়নি। ২০২৫ সাল গোটাটাই পড়ুয়াশূন্য ছিল। ২০২৬ সালে সেশনের শুরুতেও পড়ুয়াহীন ওই স্কুল।
গত শুক্রবার ওই স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ দাস স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত। স্কুলের সামনের বড় মাঠে সেদ্ধ করা ধান শুকোতে দেওয়া হয়েছে। গ্রামের পুরুষ, মহিলারা সেখানে বসে আছেন। তাঁদের সঙ্গেই আড্ডায় ব্যস্ত প্রধান শিক্ষক। ওই বিদ্যালয় লাগোয়া তিনটি নার্সারি স্কুল গড়ে উঠেছে। প্রাইভেট স্কুলের কর্মকর্তারা অভিভাবকদের ‘ম্যানেজ’ করে তাঁদের পড়ুয়াদের ভর্তি করাতে সফল হচ্ছেন। আর খটিয়াবসানের শিক্ষকরা পড়ুয়া আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ দেখাননি। কেউ কেউ বলছেন, প্রধান শিক্ষক নিজেই ২০২৫ সালে তাঁর স্কুল থেকে সাত খুদে পড়ুয়াকে নার্সারিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের মগজধোলাই করেছেন। যদিও সেই অভিযোগ মানতে নারাজ প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ দাস।
তিনি বলেন, আমরা এই স্কুলটি স্বাভাবিকভাবে চালু করার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি। পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়েছি। কিন্তু তাঁরা আমাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক নিজে স্কুলে এসে এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়েছিলেন। এলাকার বিশিষ্ট মানুষজনও চান, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়ারা আসুক। স্কুলে পঠনপাঠন হোক। কিন্তু অভিভাবকরা শিশুদের না পাঠালে আমরা কী করব?