অচেনা নম্বর থেকে ফোন। ফোন ধরলেই শোনা যাবে পরিচিত রাজনৈতিক নেতার স্বর। তিনি জানতে চাইবেন আপনার প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তির কথা। গত লোকসভা ভোটের আগে এমন ফোন পেয়েছেন অনেকে। আগামী বিধানসভা ভোটের আগে পেতে পারেন আপনিও।
বাস্তবে সেই নেতা কিন্তু আপনাকে ফোন করেননি। এমনও হতে পারে, তিনি প্রয়াত। তবু যে তাঁর স্বর শোনা যাচ্ছে, তার কৃতিত্ব যন্ত্র মেধার। এই যন্ত্র মেধা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সংক্ষেপে এআই) এবং তার সঙ্গে ভোটারের তথ্য মিলে বদলে দিচ্ছে হালের ভোট-রাজনীতির পরিসর।
গত লোকসভা ভোট থেকে দেশে নির্বাচনী প্রচারে যন্ত্র মেধার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। ওই ভোটে সাড়ে ৪০০ কোটি টাকারও বেশি রাজনৈতিক দলগুলি ব্যয় করেছে যন্ত্র-মেধা নির্ভর প্রচারের উপাদান তৈরি করতে। হাতে হাতে মোবাইল ফোন আর সস্তা মোবাইল ডেটা— এই দুইয়ে ভরসা করেই যন্ত্র-মেধা দিয়ে তৈরি অডিয়ো, ভিডিয়ো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মোবাইলে, সমাজমাধ্যমে। বাংলার আসন্ন বিধানসভা ভোটেও যে এই ধরনের প্রচারের রমরমা দেখা যাবে, তা নিশ্চিত। বলছিলেন দেশে যন্ত্র-মেধায় ভোট প্রচারের উপাদান তৈরির অন্যতম পুরোধা দিব্যেন্দ্র সিংহ জাদৌন। রাজস্থানের অজমেঢ়ে বসে দিব্যেন্দ্র বিজেপি, কংগ্রেসের প্রচারের উপাদান তৈরি করেছেন গত লোকসভা ভোটে। কেবল দেশের বিভিন্ন রাজ্যেই নয়, ভারতীয় বংশোদ্ভূত অধ্যুষিত দক্ষিণ আমেরিকার দেশ সুরিনামের ভোট প্রচারেও ব্যবহার হয়েছে তাঁর তৈরি ‘কনটেন্ট’। বাংলায় কাদের কাজ তিনি করছেন, কী কাজ করছেন, তা বিশেষ খোলসা করতে চাইলেন না দিব্যেন্দ্র। তবে এটুকু জানালেন, বাংলার বিধানসভা ভোটে প্রচারের কাজের জন্যও ইতিমধ্যেই তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছে নানা শিবির থেকে।
লকডাউনের সময় বাড়িতে বসে ডিপফেক ভিডিয়ো তৈরি করে ইনস্টাগ্রামে আপলোড করতেন দিব্যেন্দ্র। ২০২২ নাগাদ সমাজমাধ্যমেই দিব্যেন্দ্রর সেই সব ভিডিয়ো চোখে পড়ে ভোট-কুশলী সাগর বিশ্নোইয়ের। দেশে ভোট প্রচারে যন্ত্র-মেধাকে আনার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ বলা চলে সাগরকে। ২০২০-তে দিল্লি বিধানসভার ভোট প্রচারে বিজেপির সহযোগী ছিলেন সাগর। সে বারই দেশে প্রথম বার ডিপফেক ভিডিয়োর মাধ্যমে প্রচার করেছিল বিজেপি, যা যন্ত্র-মেধার সাহায্যেই তৈরি। ওই ভোটে বিজেপি তাদের রাজ্য সভাপতি মনোজ তিওয়ারির নানা ভাষায় ভোট চাওয়ার একটি ভিডিয়ো তৈরি করেছিল। তাঁর ঠোঁট নড়া, গলার শব্দ ও মুখের অভিব্যক্তি প্রযুক্তি, তথা যন্ত্র-মেধার সাহায্যে বসানো হয়েছিল। সেই প্রচারের পিছনের মস্তিষ্ক সাগরই রাজনৈতিক দলগুলির প্রচারের পেশাদারি কাজে নিয়ে আসেন দিব্যেন্দ্রকে।
দিব্যেন্দ্র জানালেন, তার পরে এই ক’বছরে আরও নিখুঁত হয়েছে তার তৈরি ‘নকল’ ভিডিয়ো। আরও সহজলভ্য হয়েছে। সে কারণেই রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমশ এই ধরনের প্রচারে বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। গত লোকসভা ভোটের সময় দিব্যেন্দ্ররা ২ কোটিরও বেশি টাকার কাজের বরাত পেয়েছিলেন। কারণ হিসেবে তাঁর ব্যাখ্যা, ‘‘বড় বড় সভা করতে অনেক বেশি খরচ হয়। তার চেয়ে এ ভাবে কোনও নেতার বার্তা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে, নিজস্ব ভাষায় পৌঁছে দেওয়া যায়।’’ কারণ, নেতা সেই ভাষা না জানলেও, যন্ত্র মেধার দৌলতে তাঁর স্বরেই অবিকল একই বয়ান তৈরি করে নেওয়া যায় নানা ভাষায়। প্রচারের এই পদ্ধতিতে ব্যক্তি ভোটারকেও অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব। তাঁর কথায়, ‘‘ভিড়ের মধ্যে থাকা কোনও ভোটারের আলাদা পরিচিতি নেই। কিন্তু তাঁর ফোনে যদি কোনও নেতার গলায় ভোটারের নিজের ভাষায় কোনও কথা বলা হয়, তা হলে ভোটারের মনে প্রভাব পড়েই।’’
এই প্রভাবের কথা অবশেষে মেনেছে নির্বাচন কমিশনও। সে জন্যই বিহারের বিধানসভা ভোটে কমিশনও প্রথম বার যন্ত্র মেধা নিয়ে নির্দেশিকা জারি করেছে। কারণ, কেবল নির্দিষ্ট নির্দেশ পেয়েই যন্ত্র মেধা এমন ছবি বা ভিডিয়ো তৈরি করছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। তাই সেটি যে কৃত্রিম, তা জানানো নিশ্চিত করতে বলেছে কমিশন।
নানা রাজ্যে কাজ করা ভোট-কুশলী সংস্থার কর্মীরাও এই প্রভাবের কথা মানছেন। বাংলার শাসক দল তৃণমূলের ভোট-কুশলী সংস্থা সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রচারের উপাদান তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাপক ভাবে ব্যবহার হচ্ছে যন্ত্র-মেধা। ওই সংস্থার প্রচার-কৌশল শাখার দায়িত্বে থাকা এক কর্মী বললেন, ‘‘যে হেতু অন্য ভাষাভাষী বহু পেশাদার কাজ করছেন, তাই স্থানীয় প্রেক্ষিত, আবেগ বুঝতেও যন্ত্র-মেধা সাহায্য করছে।’’
এ ভাবে যন্ত্র মেধাকে ব্যবহার করে ‘নকল’ উপাদানে প্রচার কি ভোটারের কাছে সত্যের অপলাপ নয়? উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন সেন্থিল নয়াগম। চেন্নাইয়ের বাসিন্দা সেন্থিলের সংস্থাও যন্ত্র মেধা নির্ভর কনটেন্ট তৈরি করে। তিনি বললেন, ‘‘রাজনৈতিক নেতারাও তো ভোটে অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। সব কি তাঁরা পূরণ করেন? যদি প্রয়াত কোনও নেতার গলায় কোনও ভোটার ফোন পান, তিনি তো জানবেনই যে, এই ফোন আসল নয়। ধরা যাক, যন্ত্র-মেধার সাহায্যে জ্যোতি বসুর গলায় কোনও প্রচারের অডিয়ো তৈরি করা হল। বয়স্কদের অনেকের উপরে তো প্রভাব পড়তেই পারে। এই ব্যক্তিগত আবেগটাই এই প্রচারের ভিত্তি।’’
ব্যক্তিগত আবেগ ছুঁতে পারলেই জানা যায় ভোটারের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ। কাজ অনেকটা সহজ হয়ে যায় রাজনৈতিক দলগুলির।