• দূষিত জলে ক্ষয়ে যাচ্ছে দাঁত, ঝুঁকে যাচ্ছে শরীর! আতঙ্কে অধীর পুরুলিয়াবাসী
    প্রতিদিন | ০৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: বাকি ছিল বান্দোয়ান। জঙ্গলমহলের সেই ব্লকেও মিলল ফ্লুরাইড। ফলে পুরুলিয়ার ২০ টি ব্লক-ই কার্যত ফ্লুরাইড কবলিত হয়ে গেল। জেলার এই সবকটি ব্লকের সর্বত্র যে এই প্রাকৃতিক খনিজ মিলছে তা নয়। কিন্তু এই ব্লক গুলির একটা বড় অংশ জুড়েই রয়েছে ফ্লুরাইড। যার জেরে কিশোর থেকে বয়স্ক, সকলেরই দাঁত ক্ষয়ে যাচ্ছে। শরীরও সামনের দিকে ঝুঁকছে। সবমিলিয়ে এই উদ্বেগজনক রিপোর্ট চলতি বছরের শেষেই স্বাস্থ্য ভবনে জমা পড়েছে। খুব শীঘ্রই এই জেলায় যে ফ্লুরাইড টাস্ক ফোর্স রয়েছে তার সদস্যরা বৈঠকে বসবে।

    পুরুলিয়া জেলার জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তর ধাপে ধাপে এই জেলার বিভিন্ন ব্লকের ভূ-গর্ভস্থ জল পরীক্ষা করে। তবে বান্দোয়ান ছাড়া সব ব্লকেই ওই প্রাকৃতিক খনিজ মিলেছিল। গত এক বছর ধরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর জেলার বিভিন্ন ব্লকগুলিতে নতুন করে এই ফ্লুরাইড পরীক্ষা করছে। তাতেই গতমাসে বান্দোয়ানে মেলে ফ্লুরাইড। যদিও এক বছরের এই পরীক্ষায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের টেস্টিং-এ এখনও হুড়া, জয়পুর ও বরাবাজারে নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি। ওই ফ্লুরাইড টাস্ক ফোর্স-র সদস্য সচিব জেলা উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক- ৪ শক্তিপদ মুর্মু বলেন, “কিছুদিন আগেই আমরা বান্দোয়ান ব্লকে ফ্লুরাইড পেয়েছি। আগে ওই ব্লক ফ্লুরাইড কবলিত ছিল না। আমরা স্বাস্থ্য ভবনে রিপোর্ট পাঠিয়েছি। খুব শীঘ্রই আমাদের টাক্স ফোর্সের বৈঠক হবে।”

    পুরুলিয়া জেলা স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, বান্দোয়ানে মোট ২৯ টি জায়গায় নমুনা সংগ্রহ করে ফ্লুরাইড পরীক্ষা হয়। তার মধ্যে ৬ টি জায়গা ছাড়া সবকটিতেই নির্দিষ্ট মাপকাঠির ওপরে অর্থাৎ ১.৫ মিলিগ্রাম-র ওপরে ফ্লুরাইড রয়েছে। মানব শরীরে যা প্রবেশ করলে ফ্লুরোসিস রোগ হয়। বান্দোয়ানের গঙ্গামান্না এলাকায় গঙ্গামান্না শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের একটি টিউবওয়েলে নমুনা সংগ্রহ করে দেখা যায় সেখানে ফ্লুরাইড-র পরিমাণ ৩ মিলিগ্রাম। একই ছবি ওই ব্লকের গুড়ুরেও। সেখানে ৩.১২ মিলিগ্রাম। অথচ জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের খাতায় বান্দোয়ান ফ্লুরাইড ছিল না। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের কার্যনির্বাহী বাস্তুকার (সিভিল) সনৎ অধিকারী বলেন, “আমাদের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯ টি ব্লকে ফ্লুরাইড ছিল। আমাদের নিজস্ব পরীক্ষাগারে তা আমরা পেয়েছি। তবে বান্দোয়ানে স্বাস্থ্য দপ্তরের যে রিপোর্টে ফ্লুরাইড মিলেছে। সেই রিপোর্ট এখনও আমাদের হাতে আসেনি। আগামী টাস্ক ফোর্সের বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা হবে।”

    কিন্তু এর মোকাবিলা হবে কি করে? জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তর জানিয়েছে, তাদের কাছে ফ্লুরাইড সংক্রান্ত রিপোর্ট আসা মাত্রই ওই সমস্ত নলকূপ তারা চিহ্নিত করে দেন। স্থানীয়দের জানিয়ে দেওয়া হয় ওই নলকূপের জল পান করা বা সেই জল থেকে রান্না যাতে না করা হয়। এছাড়া অন্যান্য কাজ করা যেতে পারে। এদিকে স্বাস্থ্যদপ্তর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র বা সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র মারফত ফ্লুরোসিস রোগের খবর মিললেই তৎক্ষণাত ব্যবস্থা নেয়। শুধু ওষুধ পাঠিয়েই কাজ শেষ নয়। জেলা থেকে একটি টিম সেখানে গিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসা করে। তবে জাতীয় ফ্লুরোসিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় এই কাজ যতটা গতির সঙ্গে করা উচিত ছিল তা এই জেলায় হয় না বলে অভিযোগ। এই রোগে আক্রান্তদের যেমন বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা, পেটে ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। এছাড়া দাঁত চকের মত সাদা দাগ, হলুদ বাদামি কালো ছোপ, এমনকী দাঁত ক্ষয় হয়ে যায়। বিভিন্ন মাংসপেশি ও অস্থি সন্ধিতে অসহ্য ব্যথা করে। হাঁটাচলা করতে অসুবিধার সঙ্গে শরীর ক্রমশ সামনের দিকে ঝুঁকে যায়। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর বলছে, গ্রামাঞ্চল থেকে এমন রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়ছে। তাই পুরুলিয়া জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর বলছে, এই রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নিবারনে ফ্লুরাইড মুক্ত জল যেমন আগে খেতে হবে। তেমনই বেশি করে সবুজ শাক-সবজি, দুধ দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া প্রয়োজনীয়। এছাড়া কলা, পেয়ারা, লেবু, বাঁধাকপি, গাজর, বিট এরকম ফল ও সবজি খাওয়া প্রয়োজন। তবে কোনওভাবেই কালো নুন, বিট নুন, তামাক সুপারি খাওয়া যাবে না।

    নজরে ফ্লুরাইড ও ফ্লুরোসিস

    প্রতি লিটার জলে ফ্লুরাইডের মাত্রা দেড় মিলিগ্রাম পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য
    দেড় গ্রামের বেশি পরিমাণে মানব শরীরে প্রবেশ করলে ফ্লুরোসিস রোগ
    বান্দোয়ানের গুড়ুরে ৩.১২ মিলিগ্রাম ফ্লুরাইড
    ৭ লক্ষণে ধরা পড়বে ফ্লুরোসিস
    ভিটামিন সি, ডি, ক্যালসিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সুরাহা
  • Link to this news (প্রতিদিন)