• ঠেলাগাড়িতে কারেন্ট নুন, হজমি, মৌরি লজেন্স নিয়ে পাকা চুলের দাদুরা, শহরের পথেঘাটে আজও উঁকি দেয় ছেলেবেলা
    বর্তমান | ০৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • সোহম কর, কলকাতা: ‘কারেন্ট নুন খেলে, জিভ পুড়ে যায়। হজমি খেলে পেট খারাপ হয়। ছোট কুল খেলে দাঁত নষ্ট হয়।’ এসব কে বলে? সে কি ঠিক বলে? 

    কারণ কলকাতার পুরনো রাস্তাগুলিতে ওঁত পেতে থাকে টাইমমেশিন। কখন যে নিজের পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে কতকাল আগের সেই দিনগুলিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, কে জানে! সে শ্যামপুকুরই হোক বা ক্যামাক স্ট্রিট। মৌলালির মোড়ই হোক বা বাগবাজার। এরকম অনেক ইতিহাস অনেক মানুষের জিম্মায় রাখা আছে। ছোট ঠেলাগাড়িতে কিছু ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন পাকা চুলের কয়েকজন দাদু। সে ইতিহাসের স্বাদ টক-ঝাল-নোনতা। সে ইতিহাস কারেন্টও দেয়। কাল যে ছিল বর্তমান আজ সে ইতিহাস। আজ যে বর্তমান সে কালকে ইতিহাস হয়ে জিভে কারেন্ট দেবেই দেবে।

    যে বালক-বালিকা ন’য়ের দশকে স্কুল থেকে ফেরার পথে হজমি, কারেন্ট নুন, টকটক লাল কুল খেত ছোট সাইজের। সে এখন বড় হয়ে গলি দিয়ে হেঁটে গেলে কখনও খপ করে ধরে টাইম মেশিনে ঢুকিয়ে দেয় অতীত। তারপর সেখান থেকে বেরোলে বোঝা যায় কলকাতার রাস্তায় অতীত-বর্তমান পাশাপাশিই থাকে। যার যেমন ভাগ্য, সে তেমনভাবে তার ছোঁয়া পায়। এখন যেমন হজমির সঙ্গে সংযোজন হয়েছে আম পাচক, চিকেন ভুজিয়া, মিষ্টি সিগারেট, আমসত্ত্ব, মৌরি লজেন্সের। ষাটোর্ধ্ব ললিতা চৌধুরীর কাছে এখনও সে ঠেলাগাড়ি সেরকমই আকর্ষণীয়। ক্যামাক স্ট্রিটের বর্ধান মার্কেটের সামনে ঠেলাগাড়ির এক মালিক দাঁড়ান। তাঁর মাথার চুল সম্পূর্ণ সাদা। আর তাঁর মুখে সর্বদাই হাসি।

    স্কুল থেকে বেরিয়ে দিদিমা ললিতার কাছে খুদের বায়না, ‘ওই মৌরি লজেন্সটা কিনে দাও!’ তার বন্ধু তার মাকে বলে, ‘কারেন্ট নুন একটুখানি দাও না।’ বায়নার সামনে পড়েও দিদা-বাবা-মা অনড়। কিনে দেবেন না কিছুতেই। তারপর কিনে দিলেন তো বটেই, নিজের জিভেও ঠেকালেন নুন। আর ছেলে যত হাসে, তার থেকেও বেশি হাসে তার মা। মৌলালিতে দাদুকে দেখেই দৌড় দিল সালমা। মায়ের কাছে বক্তব্য, ‘আজকে কিন্তু দুটো আম পাচক কিনে দেবে বলেছিলে।’ প্রতিদিন এসব দেখে অভ্যস্ত বৃদ্ধ নাজিমউদ্দিন। বলেন, ‘আমি তো ছোটবেলা থেকে দোকান দিচ্ছি। এসব রোজ দেখি। অনেকের বাবা-মা এসেও কেনে।’ বড়বাজারের এক জায়গায় এসব জিনিস কিনতে পাওয়া যায়। সেখান থেকে কিনে শহরের রাস্তায় বিক্রি করেন নাজিমউদ্দিনরা। ‘আমার ছেলে এসব করে না। আমি চলে গেলে এ জিনিস আর থাকবে না।’ খুব দুঃখ নাজিমউদ্দিনের। 

    তবুও নাজিমউদ্দিনরা থেকে যান রাস্তায়। বর্তমানের মধ্যে ইতিহাস হয়ে এখনও হাতছানি দেন বাবা-মা-দাদু-দিদাদের, ডেকে আনেন তাঁদের ছেলে-মেয়ে-নাতি-নাতনিদের।
  • Link to this news (বর্তমান)