• ভিন রাজ্যে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে গণধোলাই ও পুড়িয়ে মারার অভিযোগ
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৭ জানুয়ারি ২০২৬
  • সাম্প্রতিক অভিযোগ বিহারের ভাগলপুর থেকে। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ থানার কুলগাছি এলাকার বাসিন্দা ফারুক শেখ ফেরি করে সংসার চালান। অভিযোগ, ভাগলপুরে ফেরি করার সময় কয়েকজন দুষ্কৃতী তাঁর পথ আটকায়। বাংলায় কথা বলার কারণেই তাঁকে বাংলাদেশি সন্দেহে বেধড়ক মারধর করা হয়। এখানেই থামেনি অত্যাচার। অভিযোগ, গায়ে কেরোসিন ঢেলে তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় কয়েকজন যুবকের তৎপরতায় প্রাণে বাঁচেন ফারুক। কোনওক্রমে বাড়ি ফিরলেও এখনও তাঁর আতঙ্ক কাটেনি।

    ভাঙা গলায় ফারুক বলেন, ‘ফেরি করে মাল বেচে ফিরছিলাম। ওরা দাঁড়াতে বলল। আমি ভাবলাম মাল নেবে। হঠাৎ বলল তুই বাংলাদেশি। বাংলায় কথা বলি বলেই বলে দিল বাংলাদেশি। জিন্দা পুড়িয়ে দেব বলছিল। গায়ে পেট্রল ঢালে। আমি ভয়েই কেঁদে ফেলি।’ তাঁর দাবি, কয়েকজন সংখ্যালঘু যুবক এগিয়ে না এলে আজ হয়তো তিনি বেঁচে ফিরতে পারতেন না।

    একই চিত্র ধরা পড়েছে বিজেপি শাসিত ছত্তিশগড়েও। পুরুলিয়া জেলার আট জন সংখ্যালঘু পরিযায়ী শ্রমিককে বজরং দলের সদস্যরা বেধড়ক মারধর করেছে বলে অভিযোগ। ঘটনায় এক শ্রমিকের হাত ভেঙে যায়। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে। জানা গিয়েছে, পুরুলিয়া মফস্বল থানার চেপড়ি গ্রামের শেখ জসিম, তাঁর ভাই শেখ আলম, শেখ বাবিন ওরফে শরিফুল, শেখ জুলফিকার, শেখ সাহিল এবং তেঁতলো গ্রামের আরবাজ কাজী, আড়শা থানার ভুরসু গ্রামের শেখ মিনাল ও শেখ ইসমাইল তিন মাস আগে রায়পুর জেলার কোতয়ালি থানার সুরজপুর এলাকায় একটি পাউরুটি কারখানায় কাজ করতে যান।

    অভিযোগ, রবিবার বিকেলে পারিশ্রমিক নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বচসার পর স্থানীয় কিছু বজরং দলের সদস্য সেখানে পৌঁছয়। বাংলায় কথা বলার জন্য তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত হন শেখ জসিম। পরে স্থানীয়দের খবর পেয়ে পুলিশ এসে আট জনকে উদ্ধার করে।

    চেপড়ি গ্রামের তৃণমূল বুথ সভাপতি শেখ ইকবাল জানান, ছত্তিশগড় পুলিশের তরফে তাঁদের নাম ও ঠিকানা যাচাই করা হয়েছে। সমস্ত নথি পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানায়। তবে পরিবারগুলির আতঙ্ক কাটছে না। আরবাজ কাজির বাবা সায়েদ কাজী বলেন, ‘আমি নিজেও ভিন রাজ্যে কাজ করি। ছেলেকে বাংলাদেশি বলে মারধর করার কথা শুনে বুক কেঁপে উঠছে।’

    এই ভয়ঙ্কর চিত্র শুধু বিহার বা ছত্তিশগড় নয়, ওড়িশাতেও মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর ধারাবাহিক হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। রাজ্য প্রশাসন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, গত তিন মাসে বিজেপি শাসিত ওই রাজ্যে ৩০ থেকে ৩৫ জন পরিযায়ী শ্রমিক হেনস্থার শিকার হয়েছেন। নিছক বাংলাদেশি সন্দেহে মারধর, ট্রেন ধরতে গিয়ে লাঠি-রড নিয়ে হামলার অভিযোগও রয়েছে। অনেকে ভয়ে ওড়িশায় ঘরবন্দি হয়ে আছেন। আবার অনেকে সবকিছু ফেলে পালিয়ে আসছেন।

    উল্লেখ্য, গত ২৬ ডিসেম্বর ওড়িশার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদের সুতি থানার চকবাহাদুরগ্রামের বাসিন্দা জুয়েল রানাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ২২ বছরের তরুণের দেহ গ্রামে ফিরতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকার বাসিন্দারা। তাঁর বন্ধু আশিক মহম্মদ ভাঙা পা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। সেই ঘটনার পর থেকেই একের পর এক পরিবারের কাছে দুঃসংবাদ আসতে শুরু করে।

    এর আগে লালগোলা ও রঘুনাথগঞ্জের ১৭ জন শ্রমিককে বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও জেলে পুরে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিহারের মোজাফ্ফরপুরেও বেলডাঙার বাসিন্দা হাফিজুল খাঁকে মোটরবাইক আটকে মারধরের অভিযোগ সামনে এসেছে।

    এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক তরজাও তুঙ্গে উঠেছে। ওড়িশার সম্বলপুরে গিয়ে পরিযায়ীদের পাশে দাঁড়ান প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী। কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছে, ‘তৃণমূল কোথায়?’ পাল্টা তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরাতে সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করা হয়েছে। সোনালি খাতুনকে ফিরিয়ে আনার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।

    রাজ্যের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ২২ লক্ষের বেশি। তার বড় অংশই মুর্শিদাবাদ থেকে ভিন রাজ্যে কাজে যান। কিন্তু কাজের সন্ধানে বাইরে যাওয়াটা এখন তাঁদের কাছে শাঁখের করাত হয়ে যাচ্ছে। আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর হেনস্থার ভয়ে অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশাহারা। রাজ্য সরকারের ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প কি এই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান করতে পারবে? সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে পরিযায়ী শ্রমিকদের মনে।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)