অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, নয়াদিল্লি
একদিকে চিরশত্রু মনোভাবাপন্ন পাকিস্তান, যাকে অতি সম্প্রতি ‘খারাপ পড়শি’ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। অন্যদিকে, নিঃসাড়ে সীমান্তবর্তী জমি দখলের তক্কে তক্কে থাকা চিন। অদূরেই রয়েছে গত দেড় বছর ধরে ‘অশান্ত’ পড়শি বাংলাদেশ, যাদের সঙ্গে সম্প্রতি সখ্য বাড়াচ্ছে পাকিস্তান! তার কিছুটা দূরেই মিয়ানমার, যেখানের রোহিঙ্গা–সঙ্কট এখনও ভারতের মাথাব্যথা৷ এমন একটা ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা কোনও দেশের পক্ষেই সুখকর নয়, কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ সামলাতে ভারত যে তৎপর, তার ইঙ্গিত মিলল আরও একবার। পড়শি দেশ নিয়ে চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্যেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব এয়ারফোর্স স্টেশনগুলির সার্বিক পরিকাঠামো উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নিল ভারত সরকার, যা এ যাবৎকালের মধ্যে অন্যতম বড় সামরিক পদক্ষেপ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
সরকারি সূত্রের দাবি, অসমের তেজপুরের এয়ারফোর্স স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে শুরু হবে কাজ৷ এর জন্য ইতিমধ্যেই জারি করা হয়েছে সরকারি বিজ্ঞপ্তি। তেজপুরের এয়ারফোর্স স্টেশনের পরিকাঠামো ঢেলে সাজার জন্য ৩৮৩ একর জমি অধিগ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷ সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় নির্দেশ মেনে গোটা বিষয়ে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে অসম সরকার৷ তেজপুর এয়ারফোর্স স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ শেষ হলে দেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ এয়ারফোর্স স্টেশনগুলিকেও ঢেলে সাজার কাজ শুরু করা হবে৷ সূত্রের দাবি, এর মধ্যে আছে পশ্চিমবঙ্গের দু’টি এয়ারফোর্স স্টেশন কলাইকুন্ডা এবং হাসিমারাও৷ তেজপুরের এয়ারফোর্স স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নয়নের পিছনে উত্তর–পূর্বের সীমান্ত সুরক্ষার অঙ্ক দেখছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। উত্তর–পূর্বের অরুণাচল–সহ বিস্তীর্ণ সীমান্তে চিনের আগ্রাসন যে ভাবে ভারতের মাথাব্যথা বাড়াচ্ছে, সেই প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আর পশ্চিমবঙ্গের কলাইকুন্ডা ও হাসিমারা থেকে বাংলাদেশ সীমান্তের দূরত্ব খুবই কম, ফলে স্ট্র্যাটেজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ এই দু’টি এয়ারফোর্স স্টেশনও।
উল্লেখ্য, গত বছরের পহেলগাম জঙ্গি–হামলার পরেই নিরাপত্তা বিষয়ক ক্যাবিনেট কমিটির (সিসিএস) বৈঠকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পাশাপাশি সীমান্ত সুরক্ষার উপরে সর্বাধিক জোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়৷ পহেলগাম হামলার প্রত্যাঘাতে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন ভারতীয় সেনার হামলায় বিপর্যস্ত পাকিস্তান মরিয়া হয়ে হাজার হাজার ড্রোন ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করিয়েছিল। সেই সময়ে ভারতের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দুরন্ত পারফর্ম করেছে, তা একবাক্যে মানছেন সেনার উচ্চপদস্থ কর্তারা। কিন্তু পাকিস্তানের ড্রোন অ্যাটাকের চেষ্টা ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কাছে এক চূড়ান্ত সতর্কতা হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত, এমনটাই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশ। সূত্রের খবর, বিশেষজ্ঞদের এই অভিমতের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছে সিসিএস৷ এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকশনেবেল গোয়েন্দা ইনপুট, যেখানে ভারতের পড়শি দেশগুলির মধ্যে কেউ যে কোনও সময়ে ‘আগ্রাসী’ হয়ে উঠলে কী ভাবে তাদের রোখা হবে, তা নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে৷
সূত্রের খবর, এর পরেই স্থির হয়েছে — যত দ্রুত সম্ভব দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব এয়ারফোর্স স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ সেরে ফেলা হবে৷ এই এয়ারফোর্স স্টেশনগুলিতে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং র্যাডার, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম–সহ আনুষাঙ্গিক ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেটস’ প্রতিস্থাপন যাতে সহজেই করা সম্ভব হয় সে দিকে বিশেষ লক্ষ্য রেখেই করা হবে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ, জানানো হয়েছে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে৷ ভারত সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রাক্তন সেনাকর্তারাও৷ ভারতীয় সেনার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল উত্পল ভট্টাচার্য বলেন, ‘অত্যন্ত সময়োপযোগী একটা সিদ্ধান্ত৷ পাকিস্তান এবং চিনের কথা মাথায় রেখে আমাদের সব দিক থেকে তৈরি থাকতেই হবে৷ এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে স্ট্র্যাটেজিক এয়ারফোর্স স্টেশনগুলির গুরুত্ব অপরিসীম৷’