হাতে হাতে মোবাইল। গণপরিবহণ হোক, বা চায়ের দোকান, অথবা চাষের জমি— মোবাইল হাতে রিল বা ছোট ভিডিয়ো দেখা এখন পরিচিত দৃশ্য। তাই বুথস্তরে সংগঠন, লোকবল না থাকলেও মোবাইলে ভিডিয়োর মধ্যে রাজনৈতিক মতবাদ ছড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে সফল ভাবে।
কিন্তু যন্ত্র-মেধা এমন ভিডিয়ো বা ছবি তৈরি করে দিতে পারে, যেখানে সত্যি-মিথ্যের বিভেদ বোঝাটা খুবই কঠিন। তাই প্রযুক্তির বিষয়ে কম সড়গড় মানুষজনের মধ্যে ভুয়ো তথ্য বা ভুয়ো প্রচারের বিপদও বেড়েছে একই সঙ্গে। যন্ত্র-মেধা বিষয়ক গবেষক ও শিক্ষক সম্বিত পাল বলেন, ‘‘যন্ত্র মেধা আসার আগে ভুয়ো খবর বা তথ্যের যে বিপদ ছিল, তা এখনও রয়েছে। বরং যন্ত্র-মেধার আসার ফলে বেড়েছে। কারণ এই প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় কম সময়ে কোনও বানানো বয়ান ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তা নজরে আসার আগে বা বন্ধ করার আগেই যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে যায়।’’
কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্তেজনার মুহূর্তে এই ধরনের কৃত্রিম ভিডিয়ো বা ছবি হিংসা ছড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনও ভোটের আগে এমন আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। ভুয়ো খবর চিহ্নিতকারী একটি সংস্থার কর্মীর কথায়, ‘‘গত লোকসভা ভোটে পাঁচ কোটিরও বেশি যন্ত্র-মেধা দিয়ে তৈরি ফোন কল করা হয়েছিল। বিহারের ভোটে একেবারে গ্রামাঞ্চলে যন্ত্র-মেধার মাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষায় তৈরি অজস্র ভিডিয়ো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ওয়টস্যাপ বা টেলিগ্রামের মতো মেসেজিং অ্যাপে বা সমাজমাধ্যমের রিলস্-এ। এই ভিডিয়ো-ছবির মধ্যে যদি কেউ ডিপফেক প্রযুক্তিতে ভুয়ো ভিডিয়ো তৈরি করে ছড়ায়, তার খোঁজ আমরা কী করে পাব?’’ রাজনৈতিক দলগুলির সমাজমাধ্যম শাখা যাঁরা দেখভাল করেন, তাঁরাও অনেকে একান্তে মানছেন, কোনও কর্মী যদি যন্ত্র-মেধা ব্যবহার করে এমন কিছু করেন, খোঁজ পেয়ে তা মুছতে মুছতেই অনেকটা ছড়িয়ে যায়। তত ক্ষণে তা নিয়ে বিবাদ বেধে যায়।
এই আবহেও যন্ত্র-মেধা যে এখন প্রচারের অন্যতম সহায়ক, তা মানছে প্রথম সারির সব রাজনৈতিক দলই। তৃণমূলের ভোট-কুশলী সংস্থার এক কর্মী বললেন, ‘‘কোনও নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ বা পরিস্থিতিকে তুলে ধরতে যে সব ভিডিয়োর মাধ্যমে প্রচার হয়, সেগুলি যন্ত্র মেধার মাধ্যমে খুব সহজে তৈরি করা যায়।’’ রাজ্য বিজেপির সমাজমাধ্যম শাখা সূত্রেও দাবি করা হয়েছে, জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্রের উপর ভিত্তি করে যন্ত্র-মেধা দিয়ে তৈরি তাদের প্রচার ভিডিয়ো ভাল সাড়া পেয়েছে। আগামী বিধানসভা ভোটের আগেও তেমন নানা ভিডিয়ো তারা তৈরি করবে।
জাতীয় স্তরে কংগ্রেস গত লোকসভা ভোটের সময় থেকেই যন্ত্র-মেধার সাহায্যে রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ভিডিয়ো তৈরি করেছে ও প্রচার করেছে। বামেরাও তাই। সিপিএমের সমাজমাধ্যম শাখার এক কর্মীর বক্তব্য, ‘‘গত লোকসভা ভোটের সময়ই যন্ত্র-মেধা দিয়ে তৈরি অ্যাঙ্কর ‘সমতা’ বা প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বক্তব্য দিয়ে তৈরি ভিডিয়ো দিয়ে প্রচার করেছি। যন্ত্র-মেধার সাহায্যে এতে চেহারা, স্বর তৈরি করা যায় বলে তা কিছুটা বেশি আকর্ষণীয় হয়, তা সত্যি।’’ ভুয়ো খবরের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতেও তারা যন্ত্র-মেধাকে কাজে লাগাচ্ছে।
যন্ত্র-মেধা এসে ভোট-রাজনীতির আরও একটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বদল এনেছে। এখন যন্ত্র-মেধার সাহায্যে দলগুলি বিভিন্ন চ্যাটবট তৈরি করছে, যেগুলি মোবাইলে সক্রিয় থাকছে সব সময়। তাই আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রচার শেষ ও ভোটদানের আগে যে সময়টা ছিল, সেই সময়েও নীরবে প্রচার চলার বাধা আর নেই।
এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কথায়, ‘‘আগে সব দলের প্রচার শেষে ভোটারের কাছে ভাবার একটা সময় থাকত। এখন সভা-মিছিল শেষ হলেও মোবাইলে প্রচার চলছে কি না, তা দেখার উপায় নেই। যন্ত্র-মেধার দৈত্য কাজ করে দিচ্ছে অনেক, কিন্তু প্রয়োজনে তাকে বোতলে বন্দি করা যাবে কি?’’