সমাধানের আশ্বাস মন্ত্রীর চটশিল্পে সঙ্কট, ক্ষোভ শাসক দলের অন্দরেই
আনন্দবাজার | ০৮ জানুয়ারি ২০২৬
চা-বাগানের পরে চটকল। সমস্যা সামলানোয় রাজ্যের শ্রম দফতরের ভূমিকা নিয়ে ফের অসন্তোষ ধূমায়িত হয়েছে শাসক শিবিরেই! বিধানসভা নির্বাচনের আগে চটশিল্পের শ্রমিকদের সঙ্কট এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় শ্রম দফতরের ‘ব্যর্থতা’ যে ভাল ইঙ্গিত দিচ্ছে না, সে দিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে শাসক দলের সংগঠনের তরফেই।
কাঁচা পাটের তীব্র ঘাটতি, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, হোর্ডিং ও কালোবাজারি এবং কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বয়ের অভাব— এই সব কারণের মিশ্রণে ফের বন্ধ হতে শুরু করেছে একের পর এক চটকল। সেই তালিকায় আগরপাড়ার প্রবর্তক জুট মিল যোগ হয়েছে মঙ্গলবার। যেখানে কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, সেখানে শিফ্ট কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের ভোগান্তি ও সরকারি ব্যর্থতার প্রতিবাদে আগামী ১২ জানুয়ারি বাম সমর্থিত ট্রেড ইউনিয়নগুলি চটশিল্পে ধর্মঘট ডেকেছে। চটে সঙ্কট গভীর এবং শ্রমিকদের প্রশ্ন যে সঙ্গত, সেই বিষয়ে একমত তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠনও। এমতাবস্থায় শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক বুধবার ২২টি সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে চটশিল্পে সার্বিক সঙ্কটের পাশাপাশি শ্রম দফতরের ভূমিকা নিয়ে শাসক-সহ সব সংগঠনই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ঠিক হয়েছে, শুক্রবার ফের এক দফা বৈঠক হবে।
শাসক দলের অন্দরেই যখন ক্ষোভ বাড়ছে, সেই সময়ে তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি-র রাজ্য সভাপতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ফের কড়া চিঠি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংহকে। ঋতব্রতের চিঠির মূল বক্তব্য, খাদ্যশস্য প্যাকেজিং-এর জন্য ৯.২২ লক্ষ বেল (এক বেলে ৫০০ বস্তা) প্লাস্টিক বস্তার বরাতের নির্দেশ দিয়ে সঙ্কটের সময়ে চটশিল্পের কফিনে আরও পেরেক গেঁথে দেওয়া হয়েছে। ফুড কর্পোরেশন (এফসিআই) এবং কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রক যৌথ ভাবে এই কাজ করে চট শ্রমিকদের বিপুল ক্ষতির মুখে ফেলেছে। তৃণমূল সাংসদের অভিযোগ, দু’বছর ধরে বস্ত্র মন্ত্রকের নীতির ব্যর্থতাই এর ফলে প্রকট।
দিল্লির দিকে আইএনটিটিইউসি তোপ ঘুরিয়ে দিলেও রাজ্যে শাসক দলের ক্ষোভ দানা বেঁধেছে শ্রম দফতরের বিরুদ্ধে। চটশিল্পের সঙ্গে জড়িত নেতাদের অভিযোগ, কাঁচা পাটের সঙ্কট মোকাবিলায় জুট কমিশনার ও কেন্দ্রের বস্ত্র মন্ত্রকের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করতে পারেনি শ্রম দফতর। সূত্রের খবর, তৃণমূলের জুট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের তরফে বিষয়টি জানানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী ও অভিষেককে। সংগঠন সূত্রের বক্তব্য, পাটের দাম এ বার ঠিকমতো মেলেনি, কাঁচা মালের সঙ্কট শুরু হয়েছিল আগেই। তার সঙ্গে কমানো হয়েছে চটকলের বরাত। শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছে বুঝে সংগঠনের তরফে আগেই শ্রম দফতরকে আর্জি জানানো হয়েছিল আগাম হস্তক্ষেপের। কিন্তু সময়মতো সক্রিয়তা তো দেখানো হয়ইনি, এমনকি ডিসেম্বরে কিছু ট্রেড ইউনিয়নকে নিয়ে শ্রম দফতরের বৈঠকে তৃণমূলের জুট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি ডাক পাননি! বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানির উপরে যে নিষেধাজ্ঞা চেপেছে, শ্রমিকদের স্বার্থে তা শিথিল করার জন্য রাজ্যের তরফে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দরবার করতে যাওয়ার প্রস্তাবেও শ্রম দফতর গুরুত্ব দেয়নি, সে কথাও জানানো হয়েছে মমতা-অভিষেককে।
ধর্মঘটের ডাকের প্রেক্ষিতে বৈঠকের পরে তৃণমূলের জুট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি এবং জগদ্দলের বিধায়ক সোমনাথ শ্যাম বলেছেন, ‘‘চটশিল্পে সমস্যা, শ্রম দফতরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের কথা, যাবতীয় বিষয়ই বলা হয়েছে সব সংগঠনের তরফে। আবার বৈঠক হবে। আমরা আমাদের মতো করে সব সময়েই চেষ্টা করেছি।’’ শ্রমমন্ত্রী মলয়ের বক্তব্য, ‘‘শ্রম দফতরও চেষ্টা করছে। ইউনিয়নগুলির সঙ্গে ৯ জানুয়ারি আবার বসা হবে, ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হবে ১৫ তারিখ। আশা করছি, ধর্মঘট প্রত্যাহার হবে।’’
শাসক দলের এক নেতা অবশ্য বলছেন, ‘‘যত সময় নষ্ট হচ্ছে, তত দিনে শ্রমিকদের রুজি-রুটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক অসন্তোষ বেড়ে চললে শিল্পাঞ্চলের কিছু বিধানসভা আসনে প্রভাব পড়তে পারে। তার দায় কে নেবে!’’