পিয়ালি মিত্র: শীতের সকালে হুলুস্থুল কলকাতায়। সাধারণ মানুষ গা গরম করতে পারুক বা না পারুক, ভোটের গনগনে আঁচে রাজনীতি বেশ ভালই পাঁকছে, তা বলাই বাহুল্য। পিঠে পুলির মরসুমে রাজ্যে কেন্দ্রীয় সংস্থা একদম পিকনিক মোডে হাঁড়ি কড়াই নিয়ে নেমে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই আই-প্যাকের অফিস এবং সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে লাগাতার কেন্দ্রীয় সংস্থার তল্লাশি। আর তাতেই বিষম চটেছন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আইপ্যাক সরকারিভাবে তৃণমূলের ভোট কৌশল নির্ধারণ করে। তাদের অফিসে থাকে তৃণমূলের অনেক দলীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আর সেখানে আচমকা ইডির তল্লাশিতে, মুখ্যমন্ত্রীও পৌঁছে গিয়েছেন। বসেছেন ধর্ণায়।
দুপুর ১টা ৩৮ মিনিট। ৪৫ মিনিট পর আইপ্যাকের (I-PAC) অফিস থেকে বেরোলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। ভিতরে এখনও তল্লাশি চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।
বাইরে এসে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, 'আমি মনে করি এটা একটা ক্রাইম। মার্ডার অফ ডেমোক্রেসি। আমাদের সব নির্বাচনী কাগজ চুরি করা হয়েছে।' এরপরই সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, 'আমি সৌজন্যতা দেখাব। কিন্তু এটা আমার দুর্বলতা ভাবলে ভুল করবেন। আমার সব আপনি লুট করবেন আর আমি কি চুপ করে বসে থাকব?'
মুখ্যমন্ত্রী জানান, 'আইপ্যাকের অফিস থেকে কী কী নথি লুট হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে ইডির বিরুদ্ধে এফআইআর করা হবে।'
অমিত শাহকে নিশানা করে বলেন, 'হিম্মত থাকলে রাজনৈতিকভাবে লড়াই করুন। তা না করে ইডিকে দিয়ে আমাদের ভোটের স্ট্র্যাটেজি চুরি করছেন? এবার আমি যদি বিজেপির অফিসে তল্লাশি করি? সেটা কি ঠিক হবে?'
বৃহস্পতিবার দুপুরে সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতরে ইডির তল্লাশি অভিযান চলছিল (ipac kolkata office)। সংস্থার প্রধান প্রতীক জৈনের (pratik jain ipac) বাড়িতে যেমন নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, তেমনই আইপ্যাকের অফিস থেকেও একাধিক ফাইলের বান্ডিল নিয়ে বেরোতে দেখা যায় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকদের (ED Raid)।
আর এরপরেই, ইডি হাইকোর্টে যাচ্ছে রাজ্যের বিরুদ্ধে।
পরে সেখান থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) অভিযোগ করেন, ভোটের কৌশল সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, দলের কাগজপত্র ও তথ্য লুট করা হয়েছে, কারণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে নামার সাহস তাদের নেই। হার্ড ডিস্ক, আর্থিক নথি এবং দলের প্রয়োজনীয় কাগজ বাজেয়াপ্ত করার কথাও তিনি জানান। পাশাপাশি সরাসরি বিজেপির দিকে আঙুল তুলে মমতা বলেন, তাঁর দেখা মতে বিজেপির মতো বড় ‘ডাকাত’ আর কেউ নেই। ইডির এই হানাকে দুর্ভাগ্যজনক বলেও মন্তব্য করেন মমতা।
যদিও বেলা গড়াতেই ইডি বিবৃতি দিয়ে জানায়, 'সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি অবৈধভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ফাইল ছিনিয়ে নিয়েছেন। দু'টি জায়গায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনুপ্রবেশ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই আমাদের এই তল্লাশি অভিযান চলছিল।'
ইডির তদন্তে বাঁধা
ইডির তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ।
বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষন।
মামলা দায়েরের অনুমতি।
আগামীকাল শুনানির সম্ভবনা
বস্তুত, এই বিবৃতি সামনে আসার পরপরই আইপ্যাকের তল্লাশিতে 'বাধা' দেওয়ার অভিযোগ তুলে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছেন। আগামী কাল শুনানির সম্ভবনা রয়েছে।
মনে করা হচ্ছে, কয়লা পাচারকাণ্ডের তদন্তে গতি বাড়িয়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নজিরবিহীন সক্রিয়তা দেখাল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। এদিন সকাল থেকে দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গের মোট ১০টি জায়গায় একযোগে তল্লাশি শুরু করেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা। তবে তদন্তের পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে দিনভর চাপানউতোর চলল রাজধানী থেকে কলকাতা— সর্বত্র। ইডির দাবি, তল্লাশি চলাকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে তদন্তের তথ্য এবং নথিপত্র ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে।
কোথায় কোথায় হানা?
ইডি সূত্রে খবর, এদিন পশ্চিমবঙ্গের ৬টি এবং দিল্লির ৪টি জায়গায় চিরুনি তল্লাশি চালানো হয়। মূলত কয়লা পাচারের টাকা কোথায় যেত, কীভাবে সেই টাকা ‘হাওয়ালা’র মাধ্যমে পাচার করা হত এবং বেআইনিভাবে নগদ টাকা তৈরির নেপথ্যে কাদের হাত রয়েছে— তা জানতেই এই ম্যারাথন হানা। গোয়েন্দাদের দাবি, পাচারচক্রের শিকড় অনেক গভীরে এবং এদিন মূলত সেই টাকার উৎস বা ‘জেনারেশন অফ ক্যাশ’-এর প্রমাণ জোগাড় করাই ছিল তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্য।
রাজনৈতিক তরজা ও ইডির ব্যাখ্যা
এদিকে কেন্দ্রীয় সংস্থার এই সক্রিয়তাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠলেও ইডি সেই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার এক পদস্থ আধিকারিক জানান, এই তল্লাশির সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এমনকী কোনো দলীয় কার্যালয়েও হানা দেওয়া হয়নি।
সামনেই নির্বাচন থাকায় এই অভিযানকে ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তবে ইডির পাল্টা দাবি, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং দমনের নিয়মিত প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। এর সাথে কোনো রাজনৈতিক নির্ঘণ্টের যোগ নেই।
২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে ইডি ৪৬টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে অনুপ মাজির হিসাবরক্ষকের থেকে এমন কিছু নথি পায়, যাতে ‘প্রোসিডস অফ ক্রাইম’ বা অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের স্পষ্ট হিসাব ছিল। এই তথ্য থেকেই জানা যায় যে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গুরুপদ মাজি প্রায় ৮৯.১১ কোটি টাকা এবং জয়দেব মণ্ডল ৫৮.০৫ কোটি টাকার বেআইনি অর্থ অনুপ মাজির সহযোগীদের মাধ্যমে পাচার করেছিলেন।
তদন্তে বাধার গুরুতর অভিযোগ
এদিনের তল্লাশির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকটি হলো তদন্তে বাধার অভিযোগ। ইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১০টি জায়গার মধ্যে ২টি ঠিকানায় তল্লাশি চালানোর সময় ‘বেআইনিভাবে’ সেখানে কিছু মানুষ ঢুকে পড়েন। অভিযোগের তির সরাসরি সাংবিধানিক পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের দিকে। ইডির দাবি, সেই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের পদের অপব্যবহার করে তদন্তকারীদের কাজে বাধা দেন এবং তাঁদের হাত থেকে নথিপত্র ছিনিয়ে নেন।
তদন্তকারী সংস্থার তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, প্রতিটি তল্লাশিই আইন মেনে এবং নির্দিষ্ট আইনি রক্ষাকবচ মেনেই করা হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও তদন্তের মাঝপথে এমন হস্তক্ষেপ এবং নথি ছিনতাইয়ের ঘটনাটি তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর একটি বড় আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে হাওয়ালা কারবার
কয়লা পাচারের লভ্যাংশ কোন পথে দিল্লির ডেরা পর্যন্ত পৌঁছত, তা নিয়ে দীর্ঘ জেরা ও তথ্য সংগ্রহের কাজ চালাচ্ছিল ইডি। এদিনের তল্লাশিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ মিলেছে বলে খবর। তবে তদন্তে বাধার ঘটনার পর ইডি পরবর্তী কী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।
সংস্থার এক উচ্চপদস্থ কর্তা বলেন, 'আমরা স্রেফ তথ্য এবং প্রমাণের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছি। নির্দিষ্ট নথির ভিত্তিতেই এই অভিযান। কাউকে বা কোনো দলকে নিশানা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।' যদিও শাসক ও বিরোধীদের দ্বন্দ্বে কয়লাকাণ্ডের এই তদন্ত এখন সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা নিয়েছে।