ধর্ম দিয়ে দেশ চালানো যায় না, সংবিধানই শেষ কথা: অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়
দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৯ জানুয়ারি ২০২৬
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, গত এক বছরে ভিন্রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া বহু পরিযায়ী শ্রমিক অমানবিক অত্যাচার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। রাজ্য সরকার এই শ্রমিকদের সহায়তার জন্য আলাদা পোর্টাল, হেল্পলাইন ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করেছে। মঞ্চে উপস্থিত একাধিক শ্রমিক নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন—কেউ ওডিশা, কেউ মধ্যপ্রদেশে কাজ করতে গিয়ে নিগৃহীত হয়েছেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২১ সালে মালদার ১২টির মধ্যে ৮টি আসনে তৃণমূল জয়ী হওয়ার পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিজেপি মালদার মানুষকে অন্য রাজ্যে গিয়ে হেনস্থা করার সাহস পায়নি। কিন্তু ২০২৪ সালে একটি আসনে কংগ্রেস ও একটি আসনে বিজেপি জয়ী হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলেছে। গাজোলের বাসিন্দা বিনয় এবং মালদা উত্তরের বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। অভিষেকের অভিযোগ, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালি শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিজেপি সাংসদরা সংসদে একটি প্রশ্নও তোলেননি।
সভায় এমন একজন ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন, যাঁকে রাজস্থানে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছিল। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল সরকার আইনি লড়াই করে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনে। অভিষেক বলেন, মুর্শিদাবাদ ও মালদার মানুষই বিজেপির জয়ের রথ থামিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছেন।
তিনি জানান, ‘শ্রমশ্রী’ পোর্টালে ইতিমধ্যেই ৬.৫ লক্ষ শ্রমিক নথিভুক্ত হয়েছেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থান না পাওয়া পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ডায়মন্ড হারবারে চালু করা তাঁর হেল্পলাইন এবার মালদার জন্যও খুলে দেওয়া হচ্ছে। “আজ থেকে মালদা আমার বিস্তৃত পরিবার,” বলেন অভিষেক।
কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ জানিয়ে তিনি বলেন, গত ছয় মাসে শুধু বাংলা বলার অপরাধে প্রায় ১,২০০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলেন—তাঁদের কি সবাইকে নিশানা করা হবে? বিজেপির শাসনে ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আক্রমণ চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিষেক বলেন, বিজেপির ৭০ জন বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও কলকাতায় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সংখ্যালঘু যুবককে মারধর করা হয়েছে। “ভাবুন তো বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী হত,” বলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, আগে মানুষ সরকার বেছে নিত, এখন কেন্দ্র ঠিক করছে কার ভোটাধিকার থাকবে।
নোটবন্দির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কালো টাকা বন্ধের নামে মানুষকে লাইনে দাঁড় করানো হয়েছিল, অথচ সমস্যার সমাধান হয়নি। এবার ‘ভোটেবন্দি’ করে মানুষকে আবার লাইনে দাঁড় করানো হচ্ছে। ভোটের দিন বিজেপিকে তার জবাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অভিষেকের দাবি, দেশের দেড় হাজার রাজনৈতিক দলের মধ্যে একমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসই বিজেপিকে পরাস্ত করার ক্ষমতা রাখে। অন্য সব দল বিজেপির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঞ্চে উপস্থিত শ্রমিকদের সঙ্গে একই সারিতে বসে খাবার খান তিনি।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে বিজেপির আক্রমণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি থেকে বিজেপির জাতীয় সভাপতি—অনেকেই ‘জয় বাংলা’ বলেছেন। তবে বিজেপি বাংলাকে ভাষা হিসেবেই মানতে চায় না। মাছ খাওয়ার জন্য বাঙালিদের ‘মুঘল’ বলার অভিযোগও করেন তিনি।দক্ষিণ দিনাজপুরের দুই শ্রমিক—অসিত সরকার ও গৌতম বর্মণের ঘটনার উল্লেখ করে অভিষেক জানান, বিজেপির বুথ সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও গৌতম বর্মণকে বিজেপি সাহায্য করেনি, তৃণমূল সরকারই তাঁদের ফিরিয়ে এনেছে।
ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতির বিরোধিতা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, অসুস্থ হলে অ্যাম্বুল্যান্স চালকের ধর্ম বা খাবার খাওয়ার সময় কৃষকের ধর্ম কেউ জিজ্ঞেস করে কি না।তিনি আশ্বাস দেন, বাংলায়ই শ্রমিকদের কাজের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে আর বাইরে যেতে না হয়। বিজেপি শাসিত রাজ্যের পাশাপাশি কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলিতেও বাঙালি শ্রমিকরা সমস্যায় পড়ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রাজ্য সরকার ১৫ বছরে কর বাড়ায়নি, বরং বছরে ২৭ হাজার কোটি টাকা খরচ করছে এই প্রকল্পে। বিজেপি নেতারা এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
SIR প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। বিহারে ও বাংলায় বহু মানুষ আত্মহত্যা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে রাজ্য সরকার কাউকে ভয় পেতে বারণ করেছে এবং আইনি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। অভিষেক ঘোষণা করেন, সংসদের আগামী অধিবেশনে বাঙালি শ্রমিকদের উপর হওয়া প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনা তোলা হবে। মালদার ১২টি আসনেই তৃণমূলকে জয়ী করার আহ্বান জানান তিনি।
আগামী ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সফরের দিনই একই ময়দানে ফের সভা করার ঘোষণা দেন অভিষেক। “ওদিন কী আসছে, তার ট্রেলার দেখানো হবে,” বলেন তিনি।প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানান, শ্রমিকদের সহায়তায় প্রশাসন, রাজ্য সরকার ও তৃণমূল একসঙ্গে কাজ করছে। শ্রমিক কার্ড, বকেয়া মজুরি ও বিদেশে থাকা শ্রমিকদের SIR শুনানি—সব ক্ষেত্রেই দল ও সরকার পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।শেষে অভিষেকের বার্তা, “বিজেপি যাবে, সংবিধান থাকবে। বাংলা থেকেই বিজেপির শেষের শুরু হবে।”