• ভ্রমণে ইতিহাস খুঁজছেন? ঠিকানা হতে পারে নাড়াজোল রাজবাড়ি
    বর্তমান | ০৯ জানুয়ারি ২০২৬
  • সংবাদদাতা, ঘাটাল: নাড়াজোল রাজবাড়ির বয়স ৬০০ বছর। অতীতের স্মৃতির আলোয় এক ঐতিহ্যবাহী গন্তব্যস্থান হিসেবে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই রাজবাড়ি। কলকাতা থেকে স্বল্প দূরত্বে দাসপুর-মেদিনীপুর রাস্তার পাশে ঠিকানা এই প্রাচীন রাজবাড়ির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই রাজবাড়ির বর্তমান অবস্থা ভগ্নপ্রায় হলেও এখানকার প্রতিটি ইট যেন ইতিহাসের কথা বলে। যারা একটু ভিন্নধর্মী ভ্রমণের স্বাদ নিতে ইচ্ছুক এবং ইতিহাসের গভীরে ডুব দিতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে একেবারে আদর্শ স্থান। নাড়াজোল নামের ব্যুৎপত্তি মেদিনীপুরের আঞ্চলিক শব্দ থেকে। ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা অংশকে বলে ‘নাড়া’, আর ‘জোল’ শব্দটি জলা বা জলাশয়ের বিকৃত রূপ। নাড়াজোল রাজবংশের সূচনা করেন উদয়নারায়ণ ঘোষ। বর্ধমানের জমিদার ইছাই ঘোষের দেওয়ান ছিলেন এই উদয়নারায়ণ। শোনা যায়, শিকারের সময় উদয়নারায়ণ এই স্থানের খোঁজ পান এবং পরে দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশে এখানে বাস করতে শুরু করেন। তখন থেকেই এই স্থানে দেবী জয়দুর্গার পুজো হয়ে আসছে।  

    সপ্তদশ শতাব্দীতে নাড়াজোল রাজবাড়ির নির্মাণ শুরু হয়। ১৮৪০ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছিল। এই রাজবাড়ি দুই ভাগে বিভক্ত। অন্তর্গড় এবং বহির্গড়। এর চারপাশে রয়েছে সুরক্ষামূলক পরিখা। রাজবাড়ি তিনতলা বিশিষ্ট একটি প্রাসাদ। ৩৬০ বিঘা জমি জুড়ে নির্মিত  প্রাসাদে রয়েছে ২৫০টি কক্ষ। নাটমন্দির রঙিন বেলজিয়াম গ্লাস এবং লোহার কারুকাজে নির্মিত। নবরত্ন, গোবিন্দজিউ মন্দির ও সীতারাম মন্দির,  দেবী জয়দুর্গার মন্দির ছাড়াও অন্তর্গড় ও বহির্গড় মিলে প্রায় ৫০টি টেরাকোটার মন্দির রয়েছে। এই স্থাপত্য শৈলিগুলিতে বাংলার পাশাপাশি ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলিরও ছাপ স্পষ্ট। সীতারাম জীউ মন্দিরে রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, এবং  হনুমানের বিগ্রহ পূজিত হয়ে আসছে।  

    এছাড়াও রাজপরিবারে রয়েছে আটচালা রীতিতে নির্মিত ষষ্ঠ শিবালয়, ২৫ চূড়াবিশিষ্ট ত্রিতল রাসমঞ্চ যা অতীতের নাড়াজোল রাজপরিবারের গৌরবময় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর। কথিত আছে, সীতারাম মন্দির নির্মাণের জন্য অযোধ্যা থেকে বেলেপাথর আনা হয়েছিল এখানে। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে রাজা মোহনলাল রামনবমীর দিন রথযাত্রা উৎসবের সূচনা করেন। এখনও রাজবাড়ি চত্বরে সেই রথ দেখতে পাবেন। 

    নাড়াজোলের রাজবাড়ি থেকে এক কিলোমিটার পূর্বে গেলেই এক কৃত্রিম দ্বীপের মাঝে নির্মিত অপূর্ব প্রাসাদ ‘জলহরি’। স্থাপত্যশৈলিতে রাজস্থানের উদয়পুরের লেক প্যালেসের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে এটি। রাজা মোহনলাল খান প্রায় ৬১ বিঘা জমি জুড়ে এই গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। দিঘির পাড় ধরে ছিল সাজানো বাগান, যার চিহ্ন এখনও মেলে।  এসবের টানেই প্রত্যেক দিন প্রচুর পর্যটকের ভিড় হয় নাড়াজোল রাজবাড়িতে। কয়েকটি সিনেমার এবং সিরিয়ালেরও শ্যুটিং হয়েছে এখানে। রাজবাড়িকে সাক্ষী রেখেই প্রেমিক-প্রেমিকারা সেলফি তোলেন। শীত পড়লেই চলে পিকনিক। রাজ পরিবারের সদস্য সন্দীপ খানের কথায়, রাজ বাড়ি পর্যটকরা নিজের দায়িত্বে ঘুরতে পারেন। ৫০০টাকার বিনিময়ে গাইডও নিতে পারেন পর্যটকরা। এলাকায় থাকার জন্য গেস্ট হাউসও রয়েছে। ২০০৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন রাজবাড়িকে হেরিটেজ ভবন হিসেবে ঘোষণা করে। সম্প্রতি রাজবাড়ির কিছু অংশের রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
  • Link to this news (বর্তমান)