নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: রাজ্যজুড়ে চলছে এসআইআরের শুনানি পর্ব। কমিশনের নোটিস পেয়ে প্রামাণ্য নথি সহ শুনানি কেন্দ্রের সামনে লাইন দিচ্ছেন ভোটাররা। বনগাঁ মহকুমার চারটি বিধানসভা তো বটেই, পাশাপাশি হাবড়া বিধানসভার ভোটারদের একটা বড় অংশ মতুয়া। এসব এলাকায় যাঁরা শুনানিতে ডাক পেয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই তার সিংহভাগ মতুয়া সম্প্রদায়ের। তাঁদের কেউ ভোটাধিকার প্রমাণের জন্য নথি হিসেবে আনছেন মতুয়া মহাসংঘের কার্ড বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের তরফে দেওয়া ‘হিন্দুত্ব সার্টিফিকেট’। কেউ আবার এনেছেন সিএএ-তে নাগরিকত্বের আবেদনপত্র। কিন্তু শুনানি কেন্দ্রের কর্মী-আধিকারিকরা তাঁদের সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন, কমিশনের নির্দিষ্ট করে দেওয়া ১১টি নথির বাইরে কোনও নথি গ্রহণ করতে অপারগ তাঁরা। কোথাও কোথাও নথি জমা নেওয়া হলেও তা যে গ্রাহ্য হবে না, জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই অবস্থায় মতুয়াগড়ে ভোটাধিকার হারানোর আতঙ্ক ক্রমশ জেঁকে বসছে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, বনগাঁ, হাবড়া সহ জেলার বিভিন্ন জায়গায় সিংহভাগ মতুয়া এমনই সব ‘অপ্রয়োজনীয়’ নথি জমা করছেন। যত নথি এখনও জমা পড়েছে, তার মধ্যে মেরেকেটে ২০ শতাংশ সঠিক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বাকি ৮০ শতাংশই এই ধরনের নথি, যা গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ যাওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
বনগাঁ মহকুমার চারটি বিধানসভা (বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণ, গাইঘাটা, বাগদা) এলাকায় ভোটে জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক শক্তি মতুয়ারা। এখানে প্রায় ছ’লক্ষের বেশি মানুষকে শুনানিতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। সিংহভাগই মতুয়া সম্প্রদায়ের। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশের কমিশন নির্দিষ্ট ১১টি নথির একটিও নেই। একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী হাবড়া বিধানসভার। সেখানকার প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ হিয়ারিংয়ে ডাক পেয়েছেন। যার মধ্যে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নিজের বা কোনও আত্মীয়ের নাম না থাকা ভোটার ৩৫ হাজার। ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ। এঁদেরও বেশিরভাগ মতুয়া সম্প্রদায়ের।
হাবড়া ১ নম্বর বিডিও অফিসে শুনানির জন্য এসেছেন মছলন্দপুরের রবি বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘আমি মতুয়া কার্ড ও সিএএ’র আবেদনের কাগজ নিয়ে এসেছিলাম। সব বাতিল করে দিয়েছেন অফিসার। বলেছেন, ১১টি নথির মধ্যে কিছু থাকলে জমা দিন।’ ষাটোর্ধ্ব সুষমা হালদার এসেছেন রাউতাড়া থেকে। তিনি বললেন, ‘সিএএ’র আবেদন ও মতুয়া কার্ড ছাড়াও আমি হিন্দুত্বের সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছিলাম। অফিসাররা তা জমা নিয়েও নিলেন। সেই সঙ্গে বললেন, এগুলি কাজে লাগবে না। তবুও নিয়ে রাখলাম।’ ফলে শুনানির পর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েই ফিরতে হচ্ছে বহু মানুষকে। তাঁরা বলছেন, ‘শেষ পর্যন্ত কী হবে, জানা নেই। এবার ভোট দিতে পারব তো?’ পাশাপাশি, বিজেপির নাগরিকত্বের ‘টোপ’ নিয়েও মতুয়াদের অসন্তোষ আর চাপা থাকছে না। এতদিন যাঁরা বিজেপির আশ্বাসে ভরসা রেখে সিএএ-তে আবেদন করেছেন বা ‘হিন্দুত্ব সার্টিফিকেট’ জোগাড় করেছেন টাকার বিনিময়ে, তাঁরা এখন পড়েছেন অথৈ জলে। বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতি বিশ্বজিৎ দাস বলেন, ‘মতুয়া ও নমঃশূদ্ররাই যে এই এসআইআরে সবথেকে বেশি বিপদে পড়বেন, এ তো আমরা আগেই বলেছি। যা পরিস্থিতি, তাতে শুনানিতে ডাক পাওয়াদের ৮০-৯০ শতাংশের নামই বাদ যেতে পারে।’ এরপরও অবশ্য বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি বিকাশ ঘোষের আশ্বাস, ‘কারও নাম বাদ যাবে না। অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’