নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কয়লা পাচারের যে মামলাকে ‘হাতিয়ার’ বানিয়ে বাংলায় ফের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ‘অতিসক্রিয়’ হয়ে উঠল, ২০২১’এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেই ‘অস্ত্র’ পুরোদমে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু লাভ হয়নি গেরুয়া শিবিরের। ‘অব কি বার দোসো পার’-এর স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। নিখুঁত ‘ইলেকশন স্ট্র্যাটেজি’র উপর ভিত্তি করে নিবিড় জনসংযোগে বিজেপিকে ‘উড়িয়ে’ দিয়েছিল জোড়াফুল শিবির। সেই স্ট্র্যাটেজিতে সাফল্য এসেছিল ২০২৪’এর লোকসভা ভোটেও। ফুলপ্রুফ রণকৌশলই যে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে তৃণমূলের অমোঘ অস্ত্র, তা উপলব্ধিতে নিয়েছেন পদ্মপার্টির নেতারা। জোড়াফুল শিবিরের নির্বাচনি রণকৌশল নির্ধারণকারী সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি’ (আইপ্যাক)। শুধু ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিই নয়, প্রার্থী বাছাই এমনকি এসআইআর পর্বে দলের ভূমিকা ও অবস্থান নির্ধারণের পাশাপাশি বছরভর তৃণমূলের লড়াইয়ের ‘রসদ’ও সরবরাহ করে এই সংস্থা। তৃণমূলের আইটি সেলও চালায় তারা। তাই বৃহস্পতিবার সকালে এই সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি ও দপ্তরে যখন ইডি হানা দিল, তাকে সরাসরি দলের ‘স্ট্র্যাটেজি’ লুটের চেষ্টা বলেই তোপ দাগল তৃণমূল। ইডি’র হানার মাঝেই দলের রণকৌশল সংক্রান্ত নথি বাঁচাতে আসরে নেমে পড়লেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইডি’র মুখ্য দরবারে পৌঁছানোর আগেই প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের আবাসস্থল ও সল্টলেক সেক্টর ফাইভের দপ্তর থেকে দলের গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করে নিয়ে আসেন তিনি।
কেন্দ্রীয় এজেন্সি মমতার বিরুদ্ধে তদন্তের নথি ও প্রমাণ ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ প্রেস বিবৃতি আকারে দিয়েছে। এই অভিযোগ সাফ উড়িয়ে দিয়ে মমতার প্রশ্ন, ‘মিথ্যে মামলা সাজিয়ে কেউ যদি আমার বাড়িতে চুরি করতে আসে, চেষ্টা করব না চুরি আটকাতে? আপনাকে যদি কেউ খুন করতে আসে, চেষ্টা করবেন না আত্মরক্ষা করতে?’ দৃশ্যত ক্ষিপ্ত তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, ‘ওরা (ইডি) আমাদের আইটি সেলের ইনচার্জের বাড়িতে হানা দিয়েছে। দলের সমস্ত হার্ড ডিস্ক, স্ট্র্যাটেজি পেপার ও নথিপত্র লুট করার জন্য এসেছিল। প্রার্থী তালিকা সহ নানা কৌশল এবং পন্থার কাগজপত্র এখানে ছিল। চুরি করে সব নিয়ে গিয়েছে। সব ডেটা, এসআইআরের তালিকা। ভোটার তালিকায় নাম বাদ দিয়েছে জানিয়ে বহু লোক নাম-নথি পাঠিয়েছে। সব চুরি করে পালিয়েছে। এটা কি ইডির কাজ?’ ডেটা চুরির বিষয়ে এফআইআর করা হবে বলেও স্পষ্ট বার্তা দেন তিনি। এই পর্বে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানায় বিঁধেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপির ইন্ধন ও নির্দেশেই যে কেন্দ্রীয় এজেন্সির হানা, তাও বুঝিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘ন্যাস্টি, নটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশকে রক্ষা করতে পারেন না, তিনি এখন দলের নথিপত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন! আমি যদি বিজেপি পার্টি অফিসে হানা দিই, তাহলে কী হবে?’ তবে ডেটা সংক্রান্ত তৃণমূল-ইডি’র পারস্পরিক দোষারোপ পর্ব আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আজ, শুক্রবার বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে শোনা হবে ইডির অভিযোগ। পাশাপাশি এজেন্সির বিরুদ্ধে অতি সক্রিয়তা এবং ডেটা চুরির অভিযোগে মামলা করা হয়েছে তৃণমূলের তরফেও।
এই আবর্তে পাঁচ বছর আগের কয়লা পাচার মামলা নিয়ে ইডির হানা যে পদ্মপার্টির নির্দেশেই, তা দাবি করা হয় জোড়াফুল শিবিরের তরফে। দাবির সপক্ষে বঙ্গ বিজেপি এবং ইডির দু’টি বিবৃতি সামনে এনেছে তারা। বেলা ২টো ৪৩’এ সেই বিবৃতি দিয়েছিল বিজেপি। তাতে বলা হয়, ইডি কোনও রাজনৈতিক দলের অফিসে হানা দেয়নি এবং মানি লন্ডারিংয়ের মামলার তদন্তেই দিল্লি ও কলকাতায় অভিযান। তার ঠিক ৩৭ মিনিট পর ইডির তরফে যে বিবৃতি জারি করা হয়, তার সুরও ছিল এক। ঘটনাক্রমভোর ৬টা ১০: আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি ও সেক্টর ফাইভের অফিসে একযোগে হানা ইডির।
১২টা ৪৩: সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের অফিসে মমতা। গাড়িতে চেপে সোজা ‘গোদরেজ ওয়াটার সাইড’ বহুতলের বেসমেন্টে। ৪ নম্বর লিফট ধরে ১১ তলায় আইপ্যাকের অফিসে ওঠেন
দুপুর ১টা: অফিস থেকে কিছু ফাইল নিয়ে সাদা রঙের গাড়িতে (ডব্লুবি ০৬ ওয়াই ৫৫৫৫) তোলা হয়। মুখ্যমন্ত্রী ঢোকার ১০ মিনিট আগে পুলিশ ওই ফাইল নামিয়ে এনেছিল। আধঘণ্টা পর আসেন ডিজি রাজীব কুমার
দুপুর ১টা ৩৮: মুখ্যমন্ত্রী অফিসের বেসমেন্টে নেমে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। ফের আইপ্যাকের অফিসে উঠে যান
বিকেল ৪টে: ডব্লুবি ০৮ আর ০০০৫ নম্বর গাড়িতে অফিসে আসেন প্রতীক জৈন
৪টে ২২: অফিস থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আউট্রাম ঘাটের উদ্দেশে রওনা হন মুখ্যমন্ত্রীঅভিযোগ দায়ের প্রতীক জৈনের পরিবারের তরফে শেক্সপিয়র সরণি থানায়