এই সময়: ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক–এর কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি ও সংস্থার অফিসে ইডি তল্লাশিকে হাতিয়ার করে ফের কেন্দ্রের বিরুদ্ধে পথে নামছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তল্লাশির নামে আসলে ’২৬–এর ভোটের আগে ইডিকে দিয়ে তৃণমূলের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা থেকে শুরু করে নির্বাচনের স্ট্র্যাটেজি চুরি করা হয়েছে— এই অভিযোগ তুলে আজ, শুক্রবার প্রতিবাদে দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর থেকে হাজরা পর্যন্ত মহামিছিল করবেন তৃণমূলনেত্রী। ইতিমধ্যে প্রতীকের পরিবারের তরফে ইডির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে। এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় এজেন্সির ‘অতি সক্রিয়তা’র বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতৃত্বও মামলা দায়ের করতে চলেছেন। অর্থাৎ, ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) মতো এই ইস্যুতেও আইনি যুদ্ধের পাশাপাশি পথে নেমে আন্দোলন চালিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতের রাস্তায় হাঁটতে চলেছে রাজ্যের শাসকদল।
এ দিনের ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবিতে প্রত্যাশিত ভাবেই সুর চড়িয়েছে বিজেপি। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ভোটের আগে ফের দুর্নীতির একটি হাতেগরম ইস্যু পেয়েও এখনও মাঠে নেমে পাল্টা আন্দোলনের ডাক এ দিন অন্তত দেয়নি গেরুয়া শিবির। বরং, দুর্নীতি ইস্যুকে অস্ত্র করার জন্য এজেন্সি ও আদালতের দিকেই বেশি করে তাকিয়ে পদ্ম–নেতৃত্ব। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী যেমন এ দিন ইডির উদ্দেশেই স্পষ্ট হুঁশিয়ারির সুরে বলেছেন, ‘এই ঘটনার পরেও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা যদি মুখ্যমন্ত্রী এবং কলকাতা পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তা হলে পশ্চিমবঙ্গে ভুল বার্তা যাবে।’ আবার রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘আজ উনি (মমতা) যে কাজ করলেন, তাতে তিনি নিজের ভাবমূর্তির কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিলেন।’ এক্ষেত্রেও যে সরাসরি পথে নেমে আন্দোলনের জায়গায় বিজেপি নেতৃত্ব আইনি লড়াইয়ের উপরেই বেশি ভরসা রাখছেন, সেটা পরিষ্কার শমীকের কথায়। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করব, এই অনধিকার চর্চা (মমতা যা করেছেন), তা বন্ধ হবে। মুখ্যমন্ত্রী কথায় কথায় বলেন, আইন আইনের পথেই চলবে। আমরা বলছি, এখানেও আইন আইনের পথে চলবে।’
কয়লা পাচারের একটি পুরোনো মামলার ভিত্তিতে এ দিনের তল্লাশি অভিযান বলে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে ইডি। তবে তৃণমূলনেত্রীর দাবি, কয়লার টাকার দুর্নীতি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করা উচিত কেন্দ্রীয় এজেন্সির। শাহ, শুভেন্দুদের বিরুদ্ধে এর আগেও চড়া সুরে আক্রমণ শানিয়েছেন মমতা। তবে এ দিন তাঁর নিশানায় ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও। এ দিন সকালে ইডির তল্লাশি চলাকালীনই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কয়লার টাকা অমিত শাহ ব্যবহার করেছেন। রাজনাথ সিং ব্যবহার করেছেন। শুভেন্দু অধিকারী ব্যবহার করেছেন। আপনি (ইডি) অমিত শাহকে রেড করুন। শুভেন্দুকে রেড করুন। রাজনাথকে রেড করুন।’ শাহের ইশারাতেই এই তল্লাশি হয়েছে বলে মনে করছেন মমতা। তাই কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘নিয়ন্ত্রণে রাখা’র জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ফের বার্তা দিয়েছেন তিনি। শাহকে ‘ন্যাস্টি হোম মিনিস্টার’ বলেও কটাক্ষ ছুড়ে দেন তৃণমূলনেত্রী।
ইডি যখন প্রতীক জৈনের বাড়ি ও আইপ্যাক–এর অফিসে তল্লাশি চালাচ্ছে, তখন দু’জায়গাতেই পৌঁছন মমতা। কেন্দ্রীয় এজেন্সি যেখানে তদন্ত করছে, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী কী ভাবে সদলবলে হাজির হলেন— এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। যদিও মমতা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আউটরাম ঘাটে একটি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘মিথ্যে কেস বানিয়ে যদি আমার বাড়িতে চুরি করতে আসে, আমি চেষ্টা করব না চুরি আটকাতে? আপনাকে যদি কেউ খুন করতে আসে, আপনি চেষ্টা করবেন না আত্মরক্ষা করতে?’ এই প্রশ্ন তুলে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’র সাপের গল্পের প্রসঙ্গ টেনে আনেন মমতা। বলেন, ‘আমি ফোঁস করলাম এই কারণেই যে, কখনও কখনও রিঅ্যাকশন ইজ় দ্য অ্যাকশন। অ্যাকশন হ্যাজ় দ্য রিঅ্যাকশন। তুমি এক গালে ঘুসি মারবে, আমি কি আর একটি গাল পেতে দেবো?’ ইডি দাবি করেছে, কোনও রাজনৈতিক পার্টিকে টার্গেট করে এই তল্লাশি অভিযান হয়নি।
কোনও রাজনৈতিক দলের অফিসেও ছিল না এই অভিযান। যদিও মমতার যুক্তি, ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক–এর সঙ্গে তৃণমূলের ‘এগ্রিমেন্ট’ রয়েছে। ‘সার’ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলকে পরামর্শ দেওয়া থেকে তৃণমূলের প্রচার কর্মসূচি, রণকৌশল সংক্রান্ত বিষয়, সংগঠনের কাজকর্মে সহায়তা করে এই ভোটকুশলী সংস্থা। সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আইপ্যাক–এর অফিস থেকে বেরিয়ে মমতা এ দিন বিকেলে বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা ক্রাইম। এটা প্রাইভেট অর্গানাইজে়শন নয়, আইপ্যাক আমাদের তৃণমূলের অনুমোদিত টিম। সেই অথরাইজ়ড টিমের কাছ থেকে সব কাগজ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, সব লুট করা হয়েছে, টেবিল ফাঁকা পড়ে রয়েছে...বিজেপিকে তো (ইডি) নোটিস পাঠায় না? ডাকাতের ডাকাত ওরা!’ বিজেপির পার্টি অফিসে যদি রাজ্য সরকারের কোনও এজেন্সি অভিযান চালায়, তখন কী হবে— হুঁশিয়ারির সুরে এই প্রশ্নও তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
যদিও মমতার এই হুঁশিয়ারি নিয়ে শমীক বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী নিজে তল্লাশি করতে এলেও স্বাগত। ওঁর জন্য মুড়ি রাখব। উনি লাল চা খেতে ভালোবাসেন। সেটাও রাখব।’ ইডির তদন্তে বাধার অভিযোগ তুলে শুভেন্দুর বক্তব্য, ‘মুখ্যমন্ত্রী যা করেছেন, সেটা সরাসরি কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তে বাধা দেওয়া। এটা মুখ্যমন্ত্রীর পুরোনো অভ্যাস। এই ঘটনার পরেও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা যদি মুখ্যমন্ত্রী এবং কলকাতা পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তা হলে বাংলার মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে।’ যদিও মমতা এ দিন একাধিক বার ব্যাখ্যা দিয়েছেন কেন তিনি প্রতীকের বাড়ি বা আইপ্যাক–এর অফিসে গিয়েছেন। মমতার কথায়, ‘প্রতীককে ফোন করেছিলাম, দেখি বেজে যাচ্ছে। তখন ক্রস চেক করে জানতে পারি, ফোন তাঁর কাছে নেই। ইডি ফোন নিয়ে নিয়েছে। যদি আমাদের কেউ সমস্যায় পড়েন, তখন আমার দায়িত্ব তাঁকে দেখা।’ তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা ইডি নিয়ে গিয়েছে বলে মমতা অভিযোগ করায় জল্পনা তৈরি হয়, তা হলে কি বিধানসভা ভোটে জোড়াফুলের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে? মমতার ব্যাখ্যা, ‘অনেক সাজেশন আসে। সেই সাজেশন আমরা সংগ্রহে রাখি। সেই সব সাজেশন নিয়ে নিয়েছে (ইডি)।...বিভিন্ন রিসার্চের কাগজ লুট করেছে। ল্যাপটপ থেকে সব ডেটা নিয়েছে। হার্ড ডিস্ক নিয়েছে। ফিনানশিয়াল পেপার, পলিটক্যাল পেপার নিয়েছে।’
মমতাকে অবশ্য লাউডন স্ট্রিটে প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরনোর সময়ে ফাইল হাতে নিয়ে আসতে দেখা যায়। সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আইপ্যাক–এর অফিসেও সিভিল ড্রেসে থাকা পুলিশকর্মীদের বেশ কিছু ফাইল নিয়ে একটি গাড়িতে রাখতে দেখা গিয়েছে। যদিও তৃণমূলনেত্রীর দাবি, ‘ওগুলো আমাদের (পার্টির) কাগজপত্র।’ জোড়াফুল নেতৃত্বের বক্তব্য, রাজ্যে চলতি ‘সার’ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের নেতা–কর্মীদের সহায়তা করছে আইপ্যাক। স্বাভাবিক ভাবে ‘সার’ সংক্রান্ত অনেক কাগজপত্র তাদের অফিসে ছিল। বিশেষ করে অনেকে শুনানিতে ডাক পেয়ে তৃণমূলের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন, তাঁদের কাগজপত্রও ছিল। এই সব কাগজও ইডি নিয়ে গিয়েছে বলে মমতার অভিযোগ। আউটরাম ঘাটের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এসআইআর–এ কত অসহায় মানুষ চিঠি পাঠিয়েছে। বলেছে, আমার নাম তোলেনি, আমাকে বাঁচান, আমার পরিবার অসহায়... এত লোক মারা গিয়েছে— সব চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে (ইডি)।’
ইডি–র তল্লাশির সময়ে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি নিয়ে বিজেপি, সিপিএম পাল্টা আক্রমণ করলেও সমাজবাদী পার্টি, আম আদমি পার্টি–সহ ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের একাধিক শরিক তৃণমূলের পাশেই জোরালো ভাবে দাঁড়িয়েছে। সপা–র সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ভয়াবহ ভাবে পর্যুদস্ত হতে চলেছে— এটা তার প্রথম প্রমাণ।’ আপ–এর সঞ্জয় সিংয়ের বক্তব্য, ‘এটা ভেনেজ়ুয়েলা নয়, এটা পশ্চিমবঙ্গ। এখানে ভোট আসন্ন, তাই ইডি পৌঁছে গিয়েছে। তৃণমূলের অফিস লুট করা গণতন্ত্র নয়, লুটতন্ত্র।’ যদিও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক কংগ্রেসের প্রদেশ নেতৃত্ব কিংবা বামেরা নির্বাচনে আইপ্যাক–এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তৃণমূলের সমালোচনা করেছে। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের কটাক্ষ, ‘স্কুল বন্ধ বা কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে তৃণমূল পথে নামে না, পরিযায়ী শ্রমিকেরা আক্রান্ত হলেও দলের কোনও সাংসদ সেখানে যান না। অথচ একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে হানা দিতেই বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। গোটা বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’