অর্পিতা হাজরা
শীতের রোদমাখা বৃহস্পতিবারের দুপুর। ঘড়িতে তখন ঠিক বেলা ১২টা। দক্ষিণ কলকাতার লাউডন স্ট্রিটের অভিজাত আবাসন চত্বরে থমথমে পরিবেশ। সকাল থেকেই বিশাল পুলিশ বাহিনী ততক্ষণে ঘিরে ফেলেছে গোটা চত্বর। ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক–এর কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে তখন তল্লাশি চালাচ্ছেন ইডির অফিসাররা। আবাসন তল্লাটে রয়েছেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরাও। মিনিট পাঁচেক আগে সেখানে পৌঁছেছেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা। হঠাৎই সেখানে হাজির মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হন্তদন্ত হয়ে খালি হাতেই মুখ্যমন্ত্রী ঢুকে পড়েন প্রতীকের আবাসনে। কিন্তু ঘণ্টা খানেক বাদে তিনি যখন সেখান থেকে বেরোলেন, তখন তাঁর হাতে ধরা একটি সবুজ রঙের ফাইল। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ইডি তল্লাশি চালালেও কী ভাবে মুখ্যমন্ত্রী ফাইল নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, তা নিয়ে ঘুরিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
কী ব্যাখ্যা দিচ্ছেন ইডি আধিকারিকরা?
ইডির এক শীর্ষ আধিকারিকের কথায়, ‘আমাদের কিছু করার ছিল না। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তখন অসংখ্য পুলিশকর্মী ছিলেন। কার্যত গোটা আবাসন এবং প্রতীকের ঘরকে নিজেদের দখলে নিয়ে ঘিরে ফেলেছিল কলকাতা পুলিশ। আমরা ছিলাম হাতেগোনা কয়েক জন। তাই মুখ্যমন্ত্রীকে আটকানো সম্ভব হয়নি।’ ইডির দাবি, লাউডন স্ট্রিটের ওই ফ্ল্যাটে যখন তল্লাশি চলছে, তখন সেখানে ছিলেন মাত্র চার জন ইডি অফিসার, যার মধ্যে এক জন মহিলা। বাইরে পাহারা দিচ্ছিলেন জনা চারেক কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী যখন ঢোকেন, তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা এবং ডিসি (সাউথ) প্রিয়ব্রত রায়। এ ছাড়া ঘরের বাইরে কলকাতা পুলিশের অন্তত ৩০ জন কর্মী–অফিসারের একটি বিশাল টিম অপেক্ষা করছিল। আবাসনের নীচেও উর্দিধারী ও সাদা পোশাকে আরও অনেক পুলিশকর্মী ছিলেন। ইডি অফিসারদের দাবি, তাঁরা এর আগে দেশের বহু জায়গায় তল্লাশি করেছেন। কিন্তু কোনও রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান নিজে এসে এ ভাবে নথিপত্র দখল করবেন, তা তাঁদের কল্পনাতীত ছিল। যদিও কী কারণে তিনি ওই ফাইল বের করেছেন, তার ব্যাখ্যাও এ দিন একাধিক বার দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ইডি সূত্রের খবর, প্রতীকের ঘরে ঢুকে তদন্তকারী অফিসারদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে যা আছে সব আমার। প্রতীক জৈনের কিছু নেই। এটা আমার অফিস। যদি বিজেপি অফিসে এ ভাবে সার্চ হতো, তবে কী হতো?’ দিল্লি থেকে উড়ে আসা ইডির ওই চার অফিসার তখন কার্যত হকচকিয়ে গিয়েছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তাঁরা শান্ত ভাবে উত্তর দেন, ‘ম্যাডাম আমরা শুধু ডিউটি করছি। এটা আমাদের কাজ। আমাদের তো ডিউটি করতে হবে।’ কিন্তু সেই যুক্তি ধোপে টেকেনি। ইডির অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী কার্যত জোর করেই বেশ কিছু ফাইল, নথিপত্র এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইস সেখান থেকে নিয়ে বেরিয়ে যান।
প্রায় একই দৃশ্য ছিল সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আইপ্যাক–এর দপ্তরেও। সেখানেও সাতসকালে পৌঁছে গিয়েছিল ইডির অন্য একটি টিম। খবর পেয়ে বেলা বাড়তেই সেখানে পৌঁছে যান বিধাননগর পুরনিগমের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী এবং একাধিক তৃণমূল কাউন্সিলার। পৌঁছন সব্যসাচী দত্ত ও দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। কিছু পরেই বিধাননগরের সিপি মুকেশ কুমারও সল্টলেকের অফিসে পৌঁছন এবং মুখ্যমন্ত্রীর পিছু পিছু সেখানে ঢোকেন ডিজিপি রাজীব কুমার। মুখ্যমন্ত্রী ঢোকার মিনিট দশেকের মধ্যে কাগজ, ফাইল ও নথি নিয়ে বের হতে দেখা যায় তাঁর সঙ্গে থাকা সাদা পোশাকের পুলিশকেও। ওই বহুতল ভবনের বেসমেন্টে বেলা পৌনে ১টা নাগাদ একটি গাড়িতে সেই সব নথি তোলা হয়। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কিছু নথি মাটিতেও পড়ে যায়, যা নিয়ে হুলস্থূল পরিস্থিতি তৈরি হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘক্ষণ আইপ্যাক–এর অফিসে বৈঠক করেন এবং বিকেল ৪টা ২৫ নাগাদ যখন বের হন, তখন বাইরে কয়েকশো তৃণমূল কর্মী-সমর্থক ‘জয় বাংলা’ এবং ‘ইডি-সিবিআই বিজেপির দালাল’ স্লোগান তুলে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন।
কেন এই নাটকীয় অভিযান?
ইডি সূত্রে খবর, ২০২০–এর কয়লা পাচার মামলা নিয়ে ফের সক্রিয় হয়েছে সংস্থাটি। অভিযোগ, অনুপ মাজি ওরফে লালার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাঁকুড়া, বর্ধমান ও পুরুলিয়া থেকে পাচার হওয়া কয়লার কয়েক কোটি টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থায় সরানো হয়েছে। এই তথ্যের সন্ধানেই বৃহস্পতিবার কলকাতার ছ’টি এবং দিল্লির চারটি জায়গায় একযোগে তল্লাশি শুরু হয়। দিল্লি থেকে একঝাঁক অফিসার আগের রাতেই কলকাতায় এসে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর এই নজিরবিহীন হস্তক্ষেপে ইডির গোটা অপারেশনটিই এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে। ইডি অফিসারদের দাবি, তাঁরা চাইলেই মুখ্যমন্ত্রীকে বাধা দিতে পারতেন না। কারণ, এতে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি হতে পারত এবং এক মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর গায়ে হাত দেওয়ার মতো ঝুঁকি কেন্দ্রীয় বাহিনী নিতে চায়নি।
এই ঘটনার রেশ গড়িয়েছে রাত পর্যন্ত। দিনভর লাউডন স্ট্রিট ও সল্টলেকে টানটান উত্তেজনার পরে বিকেলে শেক্সপিয়ার সরণি থানায় দু’টি মামলা দায়ের হয়। প্রতীকের পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ইডি তল্লাশির সময়ে নথিপত্র চুরি গিয়েছে। অন্য দিকে, কলকাতা পুলিশের তরফেও একটি মামলা দায়ের হয়েছে অজ্ঞাতপরিচয় ইডি অফিসার ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে তাঁরা পুলিশের কাজে বাধা দিয়েছেন।