মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই তল্লাশিকে সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তরের অভিযান বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে শাসক দলের কৌশলগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ। সেই অভিযোগকে সামনে রেখেই শুক্রবার দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর থেকে প্রতিবাদ মিছিল শুরু করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিধায়ক, সাংসদ ও বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক।
মিছিল শুরুর আগে দিল্লিতে তৃণমূল সাংসদদের আটকের ঘটনায় ক্ষোভ উগরে দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘সংসদের প্রতিনিধিদের যেভাবে হেনস্থা করা হয়েছে, তা লজ্জাজনক।’ তাঁর অভিযোগ, ‘কেন্দ্রীয় দপ্তরকে দিয়ে বিরোধী দলকে ভয় দেখানো হচ্ছে।’
এদিকে এই রাজনৈতিক আবহেই কলকাতা হাইকোর্টে ইডি’র তল্লাশি সংক্রান্ত তিনটি মামলার শুনানি পিছিয়ে গিয়েছে। বিচারপতি শুভ্র ঘোষের একক বেঞ্চে মামলাগুলি ওঠার কথা থাকলেও আদালত কক্ষে ‘অনিয়ন্ত্রিত ভিড়’-এর কারণে শুনানি আগামী ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতুবি রাখা হয়েছে। ইডির দায়ের করা মূল মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী সাংবিধানিক পদে থেকে তল্লাশি কাজে বাধা দিয়েছেন। এর পাল্টা হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রতীক জৈন আদালতে পৃথক আবেদন করে দাবি করেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই এই তল্লাশি চালানো এবং বেআইনিভাবে গোপন তথ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দপ্তরের সামনে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আটক হন মহুয়া মৈত্র সহ তৃণমূলের বেশ কয়েকজন সাংসদ। পরে তাঁদের মুক্তি দেয় পুলিশ। সাংসদ মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেন, ‘ইডি তদন্ত নয়, চুরি করতে এসেছিল। আমাদের নির্বাচনী তথ্য ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আইপ্যাক-এর দপ্তরে রাখা ছিল। ভোটের ঠিক আগে সেই তথ্য নষ্ট করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।’ তাঁর দাবি, নিজের সম্পত্তি রক্ষা করা নাগরিকের অধিকার, আর সেটাই দল করেছে।
এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ইডির কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীও তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করেছে। সাংসদ রবি শঙ্কর প্রসাদ বলেন, ‘স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে ঘটেনি। মুখ্যমন্ত্রীর আচরণ অসাংবিধানিক।’ রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, ‘তল্লাশির সময় প্রমাণ সরানো একটি ফৌজদারি অপরাধ।’
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে বলেন, ‘সংস্থাগুলিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর গণতন্ত্রকে অবমাননা করা হচ্ছে।’ বাম ও কংগ্রেসও ইডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সিপিআই-এর সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা বলেন, ‘নির্বাচনের মুখে হঠাৎ করে এই তৎপরতা যথেষ্ট সন্দেহের সৃষ্টি করছে।’ এ প্রসঙ্গে কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনাতে ইডিকে ‘ভোটের দপ্তর’ বলে কটাক্ষ করেছেন।
যদিও রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস এই বিষয়ে আপাতত কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি যেহেতু আদালতের বিচারাধীন, তাই রায়ের পরেই প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে। এর মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী কলকাতার দু’টি থানায় ইডি তল্লাশি সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের করেছেন, যেখানে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আইপ্যাক-এর দপ্তরে ইডি তল্লাশি শুধুমাত্র একটি তদন্তেই সীমাবদ্ধ নেই। তা এখন রাজ্য-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। ফলে আদালত, রাজপথ, দিল্লি ও রাজভবন— সব জায়গাতেই সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।