পিয়ালী মিত্র: আই-প্যাক অফিসে তল্লাশি ঘিরে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) এবং রাজ্য সরকারের সংঘাত এবার আইনি লড়াইয়ে মোড় নিল। কলকাতা হাইকোর্টে দাখিল করা এক আবেদনে ইডি দাবি করেছে, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে তল্লাশি চলাকালীন দপ্তরে ঢুকে পড়ে কেন্দ্রীয় এজেন্সির কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন।
কলকাতা হাইকোর্টে দাখিল করা ইডি-র আবেদনে কী বলা হয়েছে? ইডির দাবি, “মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী সিপি এবং ডিসিপি সহ অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রবেশ করেন এবং তল্লাশিতে বাধা দেন। ডিজিটাল ফরেনসিক এবং ইমেল ডাম্পের কাজ ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং ফরেন্সিক সহকারী (সাইবার ল্যাব, ইডি) যোগদান করে আইনসম্মতভাবে তথ্য নিষ্কাশনের কাজ শুরু করেছিলেন।
আবেদন উল্লেখ করা হয়েছে-
* রাজ্য পুলিস ইডির তরফে সংগৃহীত ও তালিকাভুক্ত নথিগুলি যে গুলো সিজ করার জন্য রাখা হয় সেগুলো নিয়ে যায়
* ডিজিটাল প্রমাণ নিষ্কাশনের কাজ মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া হয়
* কম্পিউটার সিস্টেম, ইমেল ডাম্প, সিসিটিভি স্টোরেজ ডিভাইস রাজ্য পুলিশ বাজেয়াপ্ত করে
* কোম্পানির কর্মীদের মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়।
এর ফলে যা ঘটেছে-
* তথ্য প্রমাণ চুরি
* Destruction of Chain of custody
* ন্যায়বিচারে বাধা সৃষ্টি
* কেন্দ্রীয় তদন্তে ফৌজদারি হস্তক্ষেপ।
* বৈজ্ঞানিক সহকারীকে শারীরিকভাবে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর রাজ্য পুলিশ তাকে আবার ভেতরে নিয়ে আসে
নথি ছিনতাই: ইডি তল্লাশি করে যে সমস্ত নথি সিজ করার জন্য তালিকাভুক্ত করেছিল, রাজ্য পুলিস সেই সমস্ত নথি নিয়ে চলে যায়।ডিজিটাল প্রমাণ নষ্ট: কম্পিউটার সিস্টেম, ইমেল ডাম্প এবং সিসিটিভি স্টোরেজ ডিভাইসগুলি ইডি-র হাত থেকে রাজ্য পুলিস নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেয়।কর্মীদের ফোন বাজেয়াপ্ত: কোম্পানির কর্মীদের মোবাইল ফোনগুলিও পুলিশ নিয়ে নেয়, যা তদন্তের স্বার্থে ইডির প্রয়োজন ছিল।শারীরিক বাধা: ইডির বৈজ্ঞানিক সহকারীকে কাজ থেকে সরিয়ে শারীরিকভাবে বাইরে বের করে দেওয়া হয়।চেইন অফ কাস্টডি ধ্বংস: তদন্তের ভাষায় কোনো প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে 'চেইন অফ কাস্টডি' অপরিহার্য। ইডির অভিযোগ, রাজ্য পুলিশের হস্তক্ষেপের ফলে সেই শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে এবং প্রমাণ চুরির ঘটনা ঘটেছে।
ইডির আবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিরাপত্তার অভাব এবং রাজ্য প্রশাসনের "সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের" কারণে কোনো ডিজিটাল ব্যাকআপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঘটনা উল্লেখ করে আবেদন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে কিছুই বাজেয়াপ্ত করা হয়নি এবং কোনো ডেটা ব্যাকআপ নেওয়া যায়নি। নিরাপত্তার কারণে তল্লাশি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তা শেষ করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়াও এবার সরাসরি সিবিআই (CBI) তদন্তের দাবি জানাল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। কলকাতা হাইকোর্টে দাখিল করা ইডির আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ফলস্বরূপ, সমগ্র রাজ্য পুলিস ব্যবস্থা তাঁর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেহেতু পুলিসই ইডির নথিপত্র এবং ডিজিটাল ডিভাইস ‘বাজেয়াপ্ত’ করেছে বলে অভিযোগ, তাই সেই পুলিসের অধীনে তদন্ত হলে সত্য সামনে আসা সম্ভব নয়। আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী এবং পুলিস আধিকারিকরা নিজেরাই তদন্তে বাধা দেওয়া এবং ইডি আধিকারিকদের ‘অন্যায়ভাবে আটকে রাখার’ অপরাধের প্রধান অংশীদার। অভিযুক্ত যখন নিজেই তদন্তের নিয়ন্ত্রক হন, তখন ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের পূর্বের বিভিন্ন রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইডি জানিয়েছে, যেখানে রাজ্যের কোনো ‘প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী’ ব্যক্তি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকেন, সেখানে তদন্তের ভার একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে থাকা উচিত। এক্ষেত্রে রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসায় সিবিআই তদন্তই একমাত্র পথ। ইডির মতে, সিবিআই রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত। একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত পরিচালনার জন্য এমন একটি সংস্থার প্রয়োজন যার ওপর রাজ্য সরকারের কোনো প্রশাসনিক চাপ থাকবে না।