অভিষেক প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করতেই ‘সৌজন্যের’ তাল কাটল ঠাকুরনগরে, মন্দির ‘শুদ্ধ’ করে ‘ধিক্কার’ স্লোগান দিলেন শান্তনুরা
আনন্দবাজার | ০৯ জানুয়ারি ২০২৬
শুরু হয়েছিল সৌজন্যে। তা গড়িয়ে গেল সঙ্ঘাতে। শুক্রবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠাকুরনগর সফর শেষ হতেই ‘শুদ্ধিকরণ’ কর্মসূচিতে নামলেন শান্তনু ঠাকুর। অভিষেক নাম না করে কটাক্ষ করেছিলেন শান্তনুকে এবং সরাসরি আক্রমণ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে। সে মন্তব্যের পরে মিনিট পাঁচেক কাটতে না-কাটতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন শান্তনু। মতুয়া ঠাকুরবাড়ির নাটমন্দির থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেকের নামে শুরু হল ‘ধিক্কার’ স্লোগান।
২০২৩ সালের জুন মাসে ‘নবজোয়ার’ কর্মসূচির মধ্যে অভিষেক ঠাকুরনগর গিয়েছিলেন। কিন্তু হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে সে বার পুজো দিতে পারেননি। কারণ, তার কিছুদিন আগে মমতা মালদহের এক সভায় গুরুচাঁদ ঠাকুরের নাম ভুল উচ্চারণ করায় শান্তনুরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন, মমতা ক্ষমা না-চাওয়া পর্যন্ত তাঁকে বা অভিষেককে হরিমন্দিরে ঢুকতে দেবেন না। সে বার অভিষেকের সফরের দিন শান্তনুর বাড়ির প্রবেশপথে পুলিশ ব্যারিকেড বসিয়ে দেওয়ায় বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। শান্তনু নিজে ব্যারিকেড ভেঙে দেন। মন্দির ঘিরে ধুন্ধুমার শুরু হয়। অনুগামীদের সঙ্গে নিয়ে মন্দিরে ঢুকে শান্তনু গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ করে দেন। অভিষেক হরিমন্দিরে ঢুকতে পারেননি।
এ বার আর তেমন পরিস্থিতি ছিল না। শান্তনু শর্ত দিয়েছিলেন, ঠাকুরবাড়ি চত্বরে পুলিশি ব্যারিকেড রাখা যাবে না, মন্দিরে পুলিশ বা ‘তৃণমূল ক্যাডার’রা ঢুকবে না, নিরাপত্তার নামে ঠাকুরবাড়িতে ভক্তদের অবাধ আনাগোনায় বাধা দেওয়া যাবে না। পুলিশ-প্রশাসন সে সব মেনেই অভিষেকের সফরের ব্যবস্থা করেছিল। অভিষেক পৌঁছনোর ঘণ্টাখানেক আগে শান্তনু বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে সব বন্দোবস্ত খতিয়েও দেখেন। ঠিক করেন, আগে নেওয়া সিন্ধান্ত মতোই অভিষেককে পুজো দিতে বাধা দেওয়া হবে না।
হরিমন্দিরের সামনেই ঠাকুরবাড়ির যে নাটমন্দির, সেখানে শান্তনুর অনুগামী মতুয়া মহাসঙ্ঘের উদ্যোগে ‘সিএএ সচেতনতা শিবির’ চলছিল। সকাল থেকে পদাধিকারীরা ভাষণ দিচ্ছিলেন। অভিষেক কাছাকাছি এসে গিয়েছেন জেনে তাঁরা কর্মসূচি কিছুক্ষণের জন্য বন্ধও রাখেন। মাইকে ঘোষণা করে জানানো হয় সে কথা। নাটমন্দিরে এবং আশেপাশে জড়ো হওয়া ভক্তদেরও বলা হয় নাটমন্দির থেকে বেরিয়ে মন্দির চত্বরে না-যেতে। স্থানাভাবে ঠাকুরবাড়ির ভিতরের দিকে চলে যেতে বলা হয়। ভক্তেরাও কথামতোই সংযত ছিলেন। অভিষেক হরিমন্দিরে ঢোকার সময়ে কেউ বাধা বা স্লোগান দেওয়ার চেষ্টা করেননি। কিন্তু হরিমন্দির ও গুরুচাঁদের মন্দিরে পুজো দিয়ে এবং বড়মার বাড়িতে শ্রদ্ধা জানিয়ে অভিষেক সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
অভিষেক প্রথমে বলেছিলেন, ‘‘এখানে কোনও রাজনৈতিক কথা বলব না।’’ কিন্তু তার ফাঁকেই নাম না-করে শান্তনুকে কটাক্ষ করেন তিনি। বলেন, ‘‘আগের বার আমাকে যিনি আটকেছিলেন, পঞ্চায়েত নির্বাচনে তিনি নিজের বুথে হেরেছিলেন।’’ এসআইআর প্রক্রিয়ায় মতুয়াদের একাংশের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা নিয়েও তিনি মুখ খোলেন। বিজেপির বিরুদ্ধে মতুয়াদের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ তোলেন। অভিষেক বলেন, ‘‘মতুয়া ভাইদের ভোট নিয়ে যাঁরা জিতেছেন, তাঁরাই বলছেন এক লক্ষ মতুয়ার নাম বাদ গেলে কিছু যায় আসে না। আমরা বলিনি।’’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বনগাঁ এবং রানাঘাটে সভা করে মতুয়াদের নাগরিকত্ব নিয়ে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন, তা তিনি পূরণ করেননি বলেও অভিষেক মন্তব্য করেন। মতুয়া ঠাকুরবাড়ি এবং ঠাকুরনগরের উন্নয়নে যা কিছু হয়েছে, তা তৃণমূলই করেছে বলেও দাবি করেন। তৃণমূলের ‘রিপোর্ট কার্ড’ পেশ করে অভিষেক প্রতিপক্ষের উদ্দেশে তাঁদের ‘রিপোর্ট কার্ড’ প্রকাশের চ্যালেঞ্জ ছোড়েন।
আধ ঘণ্টার ঠাকুরনগর সফরে সংবাদমাধ্যমের সামনে অভিষেকের বক্তব্য ছিল মিনিট পাঁচেকের। কিন্তু তাঁর বক্তব্য কানে যেতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন শান্তনু। অনুগামীদের নিয়ে সরাসরি হরিমন্দিরে যান। জানান, কামনাসাগরের (ঠাকুরবাড়ি চত্বরে পুণ্যস্নানের জলাশয়) জল ঢেলে মন্দিরের ‘শুদ্ধিকরণ’ করাবেন। নাটমন্দির থেকেও মমতা এবং অভিষেককে ‘ধিক্কার’ জানিয়ে স্লোগান দেওয়া শুরু হয়। শান্তনু বলেন, ‘’রাজনৈতিক কথা বলব না বলেও ঠাকুরবাড়ি চত্বরে দাঁড়িয়ে যে ভাবে প্রধানমন্ত্রীকে অভিষেক আক্রমণ করে গিয়েছেন, তার প্রতিবাদেই আমরা ধিক্কার জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী মোদী মতুয়াদের জন্য যা করেছেন, তা কোনও সরকার করেনি। সেই প্রধানমন্ত্রীকে মতুয়াদের ধর্মস্থানে দাঁড়িয়ে কেউ আক্রমণ করলে মতুয়ারা মেনে নেবেন না।’’
এত কাণ্ডের মাঝে চোখে পড়ার মতো নির্লিপ্তি ছিল ঠাকুরবাড়ির আর এক শিবিরে। তিনি সুব্রত ঠাকুর। বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনুর বাড়ি এবং তৃণমূল সাংসদ তথা মতুয়া উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান মমতাবালার বাড়ি ঘিরে শুক্রবার সকাল থেকেই সাজো সাজো রব ছিল। অনুগামীদের ভিড় আর নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই দুই বাড়ির মাঝে গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক সুব্রতের বাড়িতে কোনও ব্যস্ততা বা তৎপরতা শুক্রবার চোখে পড়েনি। তাঁর ভাই শান্তনু যখন তৃণমূলের সঙ্গে দিনভর স্নায়ুর লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন সুব্রতকে সারা দিনে একবারের জন্যও দেখা যায়নি। ঠাকুরবাড়ি সূত্রের দাবি, সুব্রত শুক্রবার ঠাকুরনগরে ছিলেনই না। তাঁর বাড়ির সামনের চত্বরও ছিল পুরোপুরি সুনসান। গাইঘাটা বিধানসভা এলাকায় সুব্রতের ‘ঘনিষ্ঠ অনুগামী’ হিসাবে যাঁরা পরিচিত, তাঁদেরও শুক্রবার ঠাকুরনগরে দেখা যায়নি।