• হারিয়ে যাওয়া কালি-কলম থেকে সহজ পাঠ, মডেল গড়ে তাক লাগাল পুরুলিয়ার স্কুলের পড়ুয়ারা
    প্রতিদিন | ১০ জানুয়ারি ২০২৬
  • সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: কেউ খুদে বিজ্ঞানী। আবার কেউ যেন নীতি নির্ধারক। কেউ আবার ইতিহাসকে তুলে আনছে। আবার কেউ হারিয়ে যাওয়া অভ্যাসকে ফিরিয়ে এনে রীতিমতো গবেষক। রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দপ্তরের স্টুডেন্ট উইকের শেষ দিনে, বৃহস্পতিবার পুরুলিয়ার আড়শার নিউ ইন্টিগ্রেটেড গভর্নমেন্ট স্কুলে এমন ছবি-ই চোখে পড়ল। যা দেখে তাক লাগল আড়শা এক নম্বর চক্রের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক শুভঙ্কর দে-র। তাঁর কথায়, “পড়ুয়ারা নিজেদের ভাবনায় যেভাবে মডেল প্রদর্শন করেছে এবং সেই মডেল নিয়ে যা ব্যাখ্যা দিয়েছে তাতে আমি অভিভূত। এই মডেল তৈরির মধ্য দিয়েও পড়ুয়াদের পাঠক্রম শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজের বিকাশ ঘটবে।”

    এদিন যে মডেলগুলো সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তার মধ্যে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া কালি কলম, ভারতের সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকার সমূহ, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহজ পাঠ, হিউম্যান স্কিন, ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটস ইন ইন্ডিয়া। এরমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল হারিয়ে যাওয়া কালি কলম। এই মডেলটি তৈরি করে স্কুলের অষ্টম শ্রেণির পাঁচ ছাত্র সূর্য মুখোপাধ্যায়, রফিক আনসারি, মহম্মদ সুফিয়ান আনসারি এবং সন্দীপ প্রামানিক। এই মডেলে তারা দেখায় পোড়া আতপ চালের গুঁড়ো, হরিতকি এবং কড়াইয়ের কালি দিয়ে লেখার কালি বানানো যায়। আর সঙ্গে দোয়াতকে তুলে ধরেছে পালকের মধ্য দিয়ে কলম বানিয়ে। সেই সঙ্গে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি করেছে কলম। কালির পাশে রাখা হয়েছে একটি ডায়েরি। যাতে সেই পালকের কলম এবং বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি কলম দিয়ে লেখা যায়। এছাড়া বাজারে প্রচলিত কালি তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নিব, ড্রপার, কার্টিজ তুলে ধরে কালি কলমের বিবর্তনকেই তুলে আনে তাঁরা।

    অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র সূর্য মুখোপাধ্যায় ও রফিক আনসারি বলে, “এখন আমরা সবাই ডট বা বল পেনে লিখি। কিন্তু আগে কালি-কলমের প্রচলন ছিল তা আমরা পাঠ্য বইয়ে পড়েছি। সেই প্রবন্ধ পড়েই এই মডেল তৈরিতে উৎসাহ পাই।” এই কাজে সহায়তা করেন ওই স্কুলের বাংলার শিক্ষিকা দেবলীনা পতি। তিনি বলেন, “ঝরনা কলমে লেখা হয়তো দ্রুত গতিতে হয় না। কিন্তু আমি কী লিখবো, তার জন্য তো ভাবতে হয়। ওই কলম ব্যবহারে সেই ভাবনাটা যেন চলে আসে।” তাই ওই মডেলের পোস্টারের শিরোনামে ছিল, ‘ঝর্ণা কলমের নিজস্ব মন ও মর্জি রয়েছে।’

    ইতিহাস বিষয়ক মডেল ছিল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটস ইন ইন্ডিয়া। দশম শ্রেণীর ছাত্রী জেসমিন খাতুন ও দিশা মাহাতো দেশের বিভিন্ন হেরিটেজ, যেমন অজন্তা গুহা, ফতেপুর সিক্রি, খাজুরাহো, উত্তরপ্রদেশের আগ্রা ফোর্ট তুলে ধরে বাঁশ কাঠি দিয়ে তৈরি ফ্রেমে। তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র রোহিত মাহাতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহজ পাঠকে তুলে ধরে একটি কুঁড়েঘরের মধ্য দিয়ে। ওই শিশু মনের ভাবনায় ঘরের নাম ছিল রবীন্দ্রনাথ ভবন। এই মডেলও এদিন প্রশংসা পায়।

    একাদশ শ্রেণির সুজাতা সিংহ, রালিকা মাঝি ও অংশু কুমার ভারতের সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকারসমূহ দিয়ে আলাদা নজর কাড়ে। স্কুলের সহকারি শিক্ষক সুকান্ত সিং সর্দার ও কৌশিক বেরা বলেন, “শুধু বিজ্ঞানভিত্তিক নয়। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন বিষয়ের মডেল তৈরি করে। তাদের ভাবনাতেই সেই মডেলগুলো উঠে আসে। আমরা কোনও ভাবনা চাপিয়ে দিই না। তাদের ভাবনা অনুযায়ী আমরা কিছু সাহায্য করি যাতে প্রদর্শনটা আরও আকর্ষণীয় হয়।”
  • Link to this news (প্রতিদিন)