• মিটিং চলাকালীনই তর্কাতর্কি! ‘ব্রেন স্ট্রোকে’ আক্রান্ত প্রবীণ শিক্ষিকা, মেদিনীপুরের জনপ্রিয় স্কুলে থ্রেট কালচার-এর অভিযোগ
    এই সময় | ১০ জানুয়ারি ২০২৬
  • সরস্বতী পুজো ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিয়ে মিটিং চলছিল। সেই মিটিংয়েই প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে প্রবল বাকযুদ্ধে জড়িয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন প্রবীণ ও ক্যান্সার আক্রান্ত এক শিক্ষিকা! যমুনা ঘোষ পালোধী নামে ওই শিক্ষিকা ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন বলে পরিবারের তরফে দাবি করা হয়েছে। মেদিনীপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে তাঁর। ঘটনাটি মেদিনীপুর শহরের প্রসিদ্ধ স্কুল অলিগঞ্জ ঋষি রাজনারায়ণ বালিকা বিদ্যালয়ের। ঘটনা ঘিরে চাঞ্চল্য জেলা শহর মেদিনীপুরে।

    জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার অলিগঞ্জ স্কুলে 'ফুড ফেস্টিভ্যাল' অনুষ্ঠিত হয়। সেই কথা মাথায় রেখে শুক্রবার বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে, শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীরা উপস্থিত হয়েছিলেন সরস্বতী পুজো ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা উপলক্ষে। বেলা ১টা নাগাদ বৈঠক শুরু হয়। সেখানেই প্রধান শিক্ষিকা সুজাতা গোস্বামী, বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষিকা যমুনা ঘোষ পালোধীকে 'অপমান' করেন বলে অভিযোগ। প্রতিবাদ করতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েন যমুনা ম্যাডামও। গত তিন-চার বছর ধরে তিনি ক্যান্সারেও আক্রান্ত। কেমো চলছে তাঁর। তার মধ্যেই এই 'ধাক্কা' সামলাতে না পেরে বৈঠক চলাকালীনই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে তাঁকে মেদিনীপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই সিটি স্ক্যান করা হলে জানা যায়, ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন প্রবীণ ও জনপ্রিয় শিক্ষিকা যমুনা ঘোষ পালোধী। এদিকে, এই ঘটনার পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকাও অসুস্থ হয়ে শহরের অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে স্কুল সূত্রে জানা যায়। ঘটনা ঘিরে শুক্রবার বিকেল নাগাদ কার্যত হুলুস্থুল কান্ড বাধে স্কুল চত্বরে। এদিন সন্ধ্যায় অসুস্থ শিক্ষিকার স্বামী শিশির পালোধী বলেন, 'আমার স্ত্রীর ৫৯ বছর বয়স। আগামী বছরই অবসর নেবেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসা চলছে। কেমো নিতে হয়। আগামী সোমবার (১২ জানুয়ারি)-ও চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা। তবে, এত সবকিছুর মধ্যেও নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন উনি (স্ত্রী)। এত সবকিছুর পরও এদিনের মিটিংয়ে আমার স্ত্রীকে নানা ভাবে কটুক্তি করেন প্রধান শিক্ষিকা। সেই অপমান সহ্য করতে না পেরেই ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। খবর পেয়ে আমি পৌঁছই। অ্যাম্বুল্যান্সে করে মেদিনীপুর শহরের একটি হাসপাতালে নিয়ে আসি। কোমর থেকে নিচের অংশ অবশ্য অবশ হয়ে গিয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ফলেই এমনটা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে শনিবার কলকাতায় নিয়ে যাব।' স্ত্রী একটু সুস্থ হলেই প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করবেন বলেও জানিয়েছেন শিশির বাবু। কিন্তু, কি নিয়ে অশান্তি বাঁধল শুক্রবার? এনিয়ে ক্যামেরার সামনে কেউই কিছু বলতে চাননি। বারবার ফোন করা হলেও, সাড়া মেলেনি প্রধান শিক্ষিকার। যমুনা দেবীর স্বামী বলেন, 'আমার স্ত্রী পদার্থবিদ্যার একজন গুণী শিক্ষিকা। ছাত্রীদের কাছে জনপ্রিয়। ৩০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন এই স্কুলে। মাত্র দু-তিন বছর হলো উনি (সুজাতা গোস্বামী) প্রধান শিক্ষিকা হয়ে এসেছেন। তারপর থেকে প্রায়ই মানসিকভাবে নির্যাতন করেন আমার স্ত্রী-কে। থ্রেট কালচার ছাড়া একে কি আর বলব!' স্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতি মদনমোহন মাইতি বলেন, 'একটা কথা কাটাকাটি হয়েছে বলে শুনেছি। প্রধান শিক্ষিকা সহ দু'জন শিক্ষিকা অসুস্থ পড়েছেন। এমন ঘটনা কেন ঘটল, তা দেখা হচ্ছে।'

    এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা জানান, 'অসুস্থতার কারণে যমুনা দিদিমণিকে গত দু-এক বছরে বেশ কিছু ছুটি নিতে হয়েছে। এনিয়ে প্রধান শিক্ষিকার মনে একটা ক্ষোভ ছিল সম্ভবত! যদিও, যমুনা দিদিমণি দায়িত্ব নিয়ে নিজের সিলেবাস শেষ করেছেন। শুক্রবারের ছুটি নিয়েও একটা মন কষাকষি ছিল দু'জনের মধ্যে। সবকিছু নিয়েই এদিন কথা কাটাকাটি, পরে উত্তেজনা তৈরি হয়।' বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের তরফে রীতা বেরা বলেন, 'যমুনা দিদিমণি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গুণী শিক্ষিকা। দীর্ঘদিন ধরে উনি অসুস্থ। স্বাভাবিকভাবেই এই খবরে আমরা চিন্তিত। সর্বোপরি, মেদিনীপুর শহরের সুপ্রাচীন ও নামি এই স্কুলে এই ধরনের ঘটনা একেবারেই কাঙ্খিত নয়। আমরা দু'জনেরই দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।' মেদিনীপুর পুরসভার চেয়ারম্যান সৌমেন খান বলেন, 'অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা! ঋষি রাজনারায়ণ বসুর নামাঙ্কিত ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলে এই ধরনের ঘটনা একেবারেই মেনে নেওয়া যায়না। আমরা অসুস্থ শিক্ষিকার পরিবারের পাশে সর্বোতভাবে থাকব।'

  • Link to this news (এই সময়)