এবার যুদ্ধ: মমতা, ‘স্ট্র্যাটেজি লুটে’র বিরুদ্ধে রাজপথে জনগর্জন,হাইকোর্টেও ধাক্কা ইডির
বর্তমান | ১০ জানুয়ারি ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কমিশন-এজেন্সি অস্ত্রে ক্ষমতার স্বার্থসিদ্ধির গেরুয়া ‘প্ল্যানিং’কে রাজনীতির ময়দানে এনে ফেললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২৪ ঘণ্টা আগে তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের দপ্তর ও ডিরেক্টর প্রতীক জৈনের বাসভবনে আচমকা হানা দিয়ে কেন্দ্রের অধীনস্থ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট যে অধ্যায়ের সূচনা করেছিল, তাকে রাজপথে নামালেন মমতা। বুঝিয়ে দিলেন, আড়ালে-আবডালে নয়, এবার যুদ্ধ হবে খোলা ময়দানে। মানুষের সামনে। আর এই লড়াইয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নন, জননেত্রী হিসাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন তৃণমূল সুপ্রিমো। শুক্রবার যাদবপুর এইট বি বাসস্ট্যান্ড থেকে হাজরা পর্যন্ত ছিল তারই ট্রায়াল রান। বাংলার অগ্নিকন্যা শুধু দেখতে চেয়েছিলেন, মানুষ তাঁর সঙ্গে আছে কি না। প্রমাণ পেলেন তিনি। তাঁর এক ডাকে গোটা দক্ষিণ কলকাতা বদলে গেল জনসমুদ্রে। ভোটের মুখে ফের অতিসক্রিয় ইডির বিরুদ্ধে জনগর্জন শোনা গেল আনাচ-কানাচ থেকে। ‘স্ট্র্যাটেজি লুটে’র প্রতিবাদে সেই মানবশৃঙ্খল সঙ্গে নিয়েই মমতা অতিক্রম করলেন ১০ কিমি পথ। আর সেই মিছিল শেষে মানুষের এই সমর্থনকে কুর্নিশ জানিয়ে নেত্রীর হুংকার, ‘সকলকে বলব, সাহস সঞ্চয় করুন। সামনেই যুদ্ধ। নির্বাচনের লড়াই। আর নির্বাচনের এই যুদ্ধে ওদের (বিজেপি) বিদায় আসন্ন। পাড়ায় পাড়ায় ওদের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিন। ওরা মানুষের ভাত মারে। বাংলাকে আঘাত করে। এবারের যুদ্ধে মানুষ ওদেরকে রাজনৈতিকভাবে উপড়ে ফেলবে।’
ভোট এলে এজেন্সি। আর ভোটে হারলে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বন্ধ করে বাংলার মানুষকে ভাতে মারা। এটাই বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকারের চেনা ছক। কিন্তু এবার? মমতার তীব্র আক্রমণ, ‘এবার গেরুয়া শিবির লক্ষ্মণরেখা পার করে ফেলেছে।’ এরপরও এমনটা চলতে থাকলে বিজেপি নেতাদের দুর্নীতি প্রকাশ্যে আনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। কোনও রাখঢাক না করে লড়াইটাকে পৌঁছে দিয়েছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় স্তরে। নাম করে বলেছেন, ‘কয়লার টাকা খান অমিত শাহ। আর ওকে টাকা পাঠায় এখানকার গদ্দার। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমার কাছে যে পেন ড্রাইভ আছে, সেটা ফাঁস করে দেব।’ আর সেই কারণেই বৃহস্পতিবার তিনি ইডি হানার সময় আইপ্যাকের অফিসে গিয়েছেন এবং কোনও অন্যায় করেননি। বুক ঠুকে এই ঘোষণাই করেছেন নেত্রী। বলেছেন, ‘আমি কাল তৃণমূলের চেয়ারপার্সন হিসাবে ঠিক করেছি। কোনও অন্যায় করিনি। আমার দলের এবং এসআইআর সংক্রান্ত তথ্য চুরি করছিল। সকাল ৬টায় ঢুকেছে। তার পরের পাঁচ ঘণ্টা কী করেছে? সব চুরি...।’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তল্লাশির বিষয় জানিয়ে আগেই তাঁকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন বলে জানান মমতা। তবে তিনি তা মিস করেন। পরে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈন ফোন না ধরায় তাঁর সন্দেহ হয়। এবং তিনি সেখানে যান।
এই জনবিস্ফোরণ যে বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা, সে নিয়ে রাজনীতির অলিন্দে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাড়তি ধাক্কা অবশ্যই হাইকোর্ট। ইডির এই হানার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল তৃণমূল। তদন্তে বাধার অভিযোগে পালটা আদালতে যায় ইডিও। বেলা আড়াইটে থেকে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে এই দুই মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল। আদালত চত্বরে ভিড় বাড়ছিল সকাল থেকেই। এজলাসে মামলা শুনতে এসেছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যও। দুপুর ২টোর পরে এজলাসে পৌঁছান বিচারপতি ঘোষ। কিন্তু ভিড়ের চাপে তিনি শুনানি শুরু করতে পারেননি। বচসা-ধাক্কাধাক্কির জেরে বিরক্ত হয়ে এজলাস ছেড়ে বেরিয়ে যান বিচারপতি। ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি তিনি মুলতুবি করে দেন। তা সত্ত্বেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে জরুরি শুনানির আর্জি জানিয়ে মেল করেছিল ইডি। তাও খারিজ হয়ে গিয়েছে। ফল? এই ‘ধর্মযুদ্ধে’র প্রথম দিনের শেষে ‘অ্যাডভান্টেজ মমতা’।