• অভাবকে সঙ্গী করেও সৃষ্টিতে মগ্ন কালীপদ, সম্বল মাটির বাড়ি, মেলেনি কেন্দ্রের সাহায্য
    এই সময় | ১০ জানুয়ারি ২০২৬
  • দিগন্ত মান্না ■ পাঁশকুড়া

    অঙ্গীকার করেছিলেন, গীতিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত জুতো পরবেন না। এলাকার মানুষ তাই কালীপদ সামাইকে 'খালিপদবাবু' বলে ডাকতেন।

    ১৯৮৫–তে সেই কালীপদ আকাশবাণীর গীতিকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তবে থেকে আজ পর্যন্ত চলছে সঙ্গীত রচনা। শুধু তো গীতিকার নন। কালীপদ আকাশবাণীর সুরকার, নাট্যকার, পালাকারও। দূরদর্শনেও সম্প্রচারিত হয়েছে তাঁর লেখা নাটক ও গান। তাঁর লেখা মাগন গানের উপরে তৈরি তথ্যচিত্র ১৬টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে।

    ১২ জানুয়ারি মুক্তি পাচ্ছে সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে স্বল্প দৈর্ঘ্যের বাংলা ছবি 'বিড়ম্বনা'। তার জন্য গান লিখেছেন কালীপদ। এমন এক সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব আজও ছোট্ট একটি মাটির ঘরে থাকেন। একাধিকবার আবেদন করেও বাড়ি তৈরির সরকারি সাহায্য পাননি। তাতে আক্ষেপ নেই শিল্পীর। অর্ধভগ্ন মাটির বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যেই সৃষ্টিতে মগ্ন তিনি।

    হাউর স্টেশন থেকে আলুগ্রাম বাজার পৌঁছনর ঠিক আগে ডান দিকে ছোট্ট একটি রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই ছেন্যাগড়। গাছগাছালি ঘেরা সেই গ্রামের এক প্রান্তে ছোট্ট মাটির বাড়িতে সস্ত্রীক কালীপদ–র সংসার। দুই মেয়ে আগমনি আর সনাতনী বিবাহিতা। কালীপদর রক্তেই শিল্প। দুই কাকা অনন্ত ও অবিনাশ সামাইয়ের লোকযাত্রার দল ছিল। গ্রামের স্কুলে সেই লোকযাত্রার মহড়া হতো। ছেলেবেলায় মহড়ার গান শুনে মুখস্থ করে আনমনে গেয়ে উঠতেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে লিখেছিলেন দেশাত্মবোধক গান 'এল কত শহিদের শোনিতে নাহিয়া, স্বাধীনতার এই দিন/তার কত ইতিহাস কালের কবলে চিরতরে হল লীন'।

    বাংলার শিক্ষক কালীপদ চৌধুরী সেই গান শুনে উৎসাহ দিয়েছিলেন ছাত্র কালীপদকে। সেই থেকে তাঁর গান লেখা শুরু। ছাত্র জীবনে বাঁশি বাজাতেন। তারপরে মদন বসু নামে সঙ্গীতের এক দৃষ্টিহীন শিক্ষকের কাছে গানের তালিম নেন। শিক্ষক কালীপদর অনুপ্রেরণায় দেশাত্মবোধক, আধুনিক, লোকগান রচনার পাশাপাশি নাটক, যাত্রাপালা, গীতিআলেখ্য রচনায় মন দেন।

    কৃষিকাজ আর গান শিখিয়ে সংসার চলত কালীপদর। স্মৃতি থেকে তুলে আনেন — আকাশবাণীতে তাঁর লেখা প্রথম গান গেয়েছিলেন সঙ্গীতশিল্পী ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়। গ্রামোফোন থেকেও তাঁর লেখা গান রেকর্ড আকারে বেরিয়েছে। গোষ্ঠগোপাল দাস, ব্রহ্মতোষ চট্টোপাধ্যায়, স্বরাজ রায়, কোনা ভদ্রের মতো শিল্পীরাও তাঁর লেখা গান গেয়েছেন। ৭০০–রও বেশি গান লিখেছেন। আকাশবাণীতে এক সময় 'সহস্র স্কন্ধ বধ রাবণ' যাত্রাপালা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। সেই যাত্রার সংলাপও লিখেছিলেন কালীপদ। যাত্রায় সীতার চরিত্রে গান গেয়েছিলেন তাঁর বড় মেয়ে আগমনি। হাউরে সুরমঞ্জুসা নামে একটি সাংস্কৃতিক সংস্থাও গড়ে তুলেছেন কালীপদ।

    গত ১ নভেম্বর দূরদর্শনে সম্প্রচারিত হয় কালীপদ–রচিত ছোটদের নাটক 'শিবুরাম'। ভিক্ষাবৃত্তি বা মাগনের গান নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। সেগুলির উপরে ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীন পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি মঞ্চ একটি তথ্যচিত্র বানিয়েছিল ২০২১–এ। সেই তথ্যচিত্রই পেয়েছে আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

    তবু, শিল্পীর পিছু ছাড়েনি অভাব। ভাঙা অ্যাসবেসটসের ছাদ দিয়ে বর্ষায় জল পড়ে। রাজ্য সরকারের শিল্পী ভাতা পান মাসে এক হাজার টাকা। ২০১৮–য় কেন্দ্রীয় সরকার পেনশন দেবে বলে চিঠি পাঠিয়েছিল। আজও চালু হয়নি। বলছেন, 'রোদ উঠলে আর বৃষ্টি পড়লে সবার প্রথমে আমি জানতে পারি। আমার বাড়ির ভাঙা ছাউনি দিয়ে সবার আগে রোদ আর বৃষ্টি আমার গায়ে এসে পড়ে। কারও প্রতি রাগ–দুঃখ–অভিমান নেই। জীবনের অধিকাংশ সময়ই তো কাটিয়ে দিলাম। গান–নাটক ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে না।'

    মুখে বলছেন বটে 'অভিমান নেই'। কিন্তু, ভরা বর্ষায় ছাদ চুঁইয়ে জলের মতোই প্রতিটি বাক্যে ঝরে পড়ে অভিমান। শুধু বছর সাতেক আগে আবার জুতো পরা শুরু করেছেন ৭২–এর কালীপদ।

  • Link to this news (এই সময়)