• আকাশ ছোঁয়া দাম, কাজ হারিয়ে বিপাকে স্বর্ণশিল্পীরা
    এই সময় | ১০ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়, উলুবেড়িয়া: সোনা ও রুপোর দাম রোজই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় সোনা ও রুপোর অলঙ্কারের চাহিদাও তলানিতে এসে ঠেকেছে। তার জেরে বিপাকে পড়েছেন হাও়ডা ও হুগলি জেলার স্বর্ণশিল্পীরা। দুই জেলার গ্রামীণ এলাকায় কয়েক লক্ষ মানুষ স্বর্ণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত।

    তাঁদের অনেকেই দমদম, সিঁথি, কেরল, মুম্বই, তামি‍লনা়ডু ও গুজরাটের বিভিন্ন সোনার অলঙ্কার তৈরির কারখানায় কাজ করেন। কিন্তু সোনা ও রুপোর দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সেই কাজ আপাতত বন্ধ। কাজ না থাকায় তাঁদের বেশিরভাগই গ্রামে ফিরে এসেছেন। বেকার অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে আর্থিক বিপর্যয় নেমে এসেছে গ্রামগুলিতে।

    হাওড়ার শ্যামপুর থানার বাছরি, সদাশিবপুর, দানপেতিয়া, পালগড়িয়া, কৃষ্ণনগর, কুল্টিকরী, বেলপুকুর, রাউতাড়া প্রভৃতি গ্রামের কয়েক হাজার যুবক সোনার কারিগর হিসাবে কাজ করেন। এই কাজ করেই তাঁরা এক সময় লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করেছেন। পরিবারে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। কিন্তু সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা এখন কার্যত পথে বসেছেন।

    তাঁদের অনেকেই জানাচ্ছেন, যাঁরা সোনার কাজ করেন, তাঁরা চাষবাসের কাজে খুব একটা অভ্যস্ত নন। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতাও তেমন নেই। ফলে তাঁরা যে বিকল্প পেশা বেছে নেবেন, সেই সুযোগ নেই। এই অবস্থায় বাড়িতে বেকার জীবন কাটাতে হচ্ছে তাঁদেরকে। শ্যামপুর ২ নম্বর ব্লকের বেলপুকুরের বাসিন্দা ভোলা বাটি জানাচ্ছেন, তাঁর চেন্নাইয়ে সোনার কারখানা রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের সোনার অলঙ্কার তৈরি হয়। বেলপুকুর ও তার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় জনা পঞ্চাশেক লোককে তিনি চেন্নাইয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সোনার কাজের জন্য। কিন্তু সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁদেরকে আর কাজ দিতে পারছেন না। সেজন্য বেশিরভাগ কারিগর গ্রামে ফিরে এসেছে।

    ভোলার কথায়, ‘চেন্নাইয়ে সোনার কাজের জন্য বছরে আমি গড়ে ৫০–৬০ জন কারিগর নিয়ে গ্রাম থেকে নিয়ে যেতাম। এখন সংখ্যাটা কমে দাঁড়িয়েছে ৮–১০ জন। চেন্নাই, মুম্বই, কেরলের মতো জায়গায় যেখানে সোনার কাজ ব্যাপকভাবে হয়, সেখানেও কারিগরদের মজুরি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সোনার কারিগররা অনেক দেশে ফিরে দিনমজুরের কাজ করছেন।’

    সোনার কাজে কেরলে গিয়েছিলেন ডিহিমণ্ডলঘাটের বাসিন্দা শেখ সাহাবুল ও শেখ রাকিবুল ইসলাম। কেরলের সোনার কাজ কমে যাওয়ায় তাঁরা গ্রামে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, কেরলে সোনার কাজ করে যে মজুরি পাওয়া যেত, তাতে থাকা–খাওয়ার খরচ–খরচা বাদ দিয়ে বাড়িতে কিছু টাকা পাঠানো যেত। এখন সেখানে সোনার কাজ করে থাকা–খাওয়ার খরচটুকুও উঠছে না। মালিকরাও না বলে দিয়েছেন। তাই তাঁরা বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। হঠাৎ রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা এখন দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। একই কারণে তামিলনাড়ু থেকে ফিরে এসেছেন শেখ নুরামিন।

    রাধানগরের যুবক সৌরভ মণ্ডল মুম্বইয়ে সোনার কাজ করতে গিয়েছিলেন। ভালো কারিগর হওয়ায় মোটা টাকা রোজগার করতেন। পুজোর আগেই তিনি বাড়ি ফিরে এসেছেন। তাঁর কথায়, ‘যেখানে কাজ করতাম সোনার দাম বাড়ার আগে ভালোই মজুরি পেতাম। এখন মজুরি তো দূরের কথা, কাজই মিলছে না। কাজ করতে গেলে খরচ–খরচাও উঠবে না।’

    কাজ না থাকায় গ্রামে ফিরে এখন চাষের কাজ করছেন উদয়নারায়ণপুরের হরিহরপুরের সোনার কারিগর শিবনাথ মাইতি, সুরজিৎ বাগরা। সুরজিৎ বলেন, ‘মুম্বইয়ে সোনার কাজে ভালোই রোজগার ছিল। এখন চাষের কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু চাষের কাজ তো সারা বছর হয় না। বাকি সময়টা কী করে চলবে, সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।’

    শ্যামপুরের কংগ্রেস নেতা আতিয়ার রহমান খান বলেন, ‘সোনার কাজ করে শ্যামপুরের বিভিন্ন গ্রামের গরিব ঘরের ছেলে–মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। পরিবারের আর্থিক দুর্দশা ঘুচেছে। হঠাৎ তারা বেকার হয়ে যাওয়ায় একটা ভয়ঙ্কর সঙ্কট তৈরি হয়েছে। একেই রাজ্যে কোনও শিল্প কল–কারখানা হচ্ছে না। এখন যদি এতগুলো মানুষ বেকার হয়ে যায়, তা হলে এঁরা অথৈ জলে পড়বে। স্বর্ণশিল্পে যাতে স্থিতাবস্থা ফেরে, সেটা সরকারকেই সুনিশ্চিত করতে হবে।’ শ্যামপুরের তৃণমূল বিধায়ক কালীপদ মণ্ডল বলেন, ‘আমার বিধানসভা এলাকায় বহু যুবক স্বর্ণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কাজ চলে যাওয়ায় তাঁরা ভীষণ অসুবিধার মধ্যে পড়েছেন। কেন্দ্রের ভুল পদক্ষেপের জন্যই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’

  • Link to this news (এই সময়)