জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: রাজ্য রাজনীতিতে গত কয়েকদিন ধরে চলা সল্টলেকের আইপ্যাক অফিসে ইডি হামলায় এবার নাটকীয় মোড়। আইনি যুদ্ধে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল। ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-এর দফতর এবং তার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর তল্লাশিকে কেন্দ্র করে যে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার জল শেষ পর্যন্ত গড়াল দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। শনিবার সুপ্রিম কোর্টে (ED in Supreme Court) ক্যাভিয়েট (Caveat) দাখিল করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার (WB Govt)। উদ্দেশ্য স্পষ্ট- ইডি যদি সুপ্রিম কোর্টে কোনও বিশেষ আবেদন জানায়, তবে রাজ্য সরকারের বক্তব্য না শুনে যেন কোনও একতরফা নির্দেশ জারি না করা হয়।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট: একটি 'সবুজ ফাইল' ও নজিরবিহীন অভিযান
ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার। ২০২০ সালের দিল্লির একটি কয়লা পাচার মামলার তদন্তে সল্টলেক সেক্টর ফাইভের আইপ্যাক অফিস এবং লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের (Prateek Jain) বাড়িতে হানা দেয় ইডি। কিন্তু এই রুটিন তল্লাশি দ্রুত রাজনৈতিক যুদ্ধে রূপ নেয় যখন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (CM Mamata Banerjee) এবং কলকাতার পুলিস কমিশনার বিনীত গোয়েল (Vineet Kumar Goel) সশরীরে পৌঁছে যান প্রতীক জৈনের আবাসনে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর মুখ্যমন্ত্রীকে একটি সবুজ ফাইল হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। এরপর তিনি সরাসরি চলে যান সল্টলেকের আইপ্যাক দফতরে। তদন্ত চলাকালীন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের এইভাবে উপস্থিতি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাছে ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ইডির দাবি, এই পদক্ষেপ কেবল অস্বাভাবিক নয়, বরং তদন্তপ্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাধা সৃষ্টির নামান্তর।
রাজনৈতিক অভিযোগ বনাম আইনি কৌশল
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই তল্লাশিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি নিয়ন্ত্রিত ইডি আসলে কয়লা পাচারের নাম করে তৃণমূলের আগামী নির্বাচনের রণকৌশল, ডেটা এবং প্রার্থী তালিকা ‘চুরি’ করতে চাইছে। তৃণমূলের দাবি, আইপ্যাক ২০১৯ সাল থেকে দলের রণকৌশল নির্ধারণে যুক্ত, তাই তাদের নথিতে হস্তক্ষেপ করার অর্থ হলো একটি রাজনৈতিক দলের গোপন তথ্যে হানা দেওয়া।
অন্যদিকে, ইডি-র লিগ্যাল সেল অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের যুক্তি, কয়লা পাচার মামলার কালো টাকা কোথায় কোথায় বিনিয়োগ হয়েছে, তার সূত্র ধরেই এই তল্লাশি। বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর ইডি এবং রাজ্য প্রশাসন—উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে ‘অসাংবিধানিক’ আচরণের অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়।
কলকাতা হাইকোর্টে তুলকালাম ও বিচারবিভাগীয় অচলাবস্থা
শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টে এই মামলার শুনানি ঘিরে তৈরি হয় লঙ্কাকাণ্ড। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে যখন শুনানি শুরু হওয়ার কথা, তখন কোর্ট চত্বর উপচে পড়ে ভিড়ে। তৃণমূলপন্থী এবং বিজেপিঘনিষ্ঠ আইনজীবীদের মধ্যে বাদানুবাদ ও চিৎকারে এজলাসের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তৃণমূলের প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় মাইক হাতে সকলকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ বারবার শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানালেও কাজ না হওয়ায় তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। শেষ পর্যন্ত মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করলেও বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে তিনি শুনানি মুলতুবি করে দেন। পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয় ১৪ জানুয়ারি।
এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে পারেনি ইডি। তাদের দাবি ছিল, যেহেতু তদন্তে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং তথ্য লোপাটের আশঙ্কা রয়েছে, তাই জরুরি শুনানি প্রয়োজন। ইডি-র তরফে কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে ইমেল করে পৃথক বেঞ্চ গঠনের আবেদন জানানো হলেও তা খারিজ হয়ে যায়। আদালত জানিয়ে দেয়, যেহেতু বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট এজলাসে বিচারাধীন, তাই তা স্থানান্তর করা সম্ভব নয়।
সুপ্রিম কোর্টে পাল্লাভারি করার লড়াই
হাইকোর্টে জরুরি শুনানির আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরেই দিল্লির নির্দেশে নড়েচড়ে বসে ইডির সদর দফতর। আইনি পরামর্শদাতাদের সঙ্গে আলোচনার পর ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সোমবারই সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ লিভ পিটিশন (SLP) দায়ের করতে পারে কেন্দ্রীয় সংস্থা। তাদের মূল দাবি হতে পারে:
১. তদন্তে মুখ্যমন্ত্রীর সশরীরে উপস্থিতিকে বিচারবিভাগীয় নজরে আনা।
২. পুলিস ও রাজ্য প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া।
৩. তদন্তের স্বার্থে এবং নথির নিরাপত্তায় বিশেষ নির্দেশিকা জারি করা।
এই সম্ভাবনা আঁচ করেই শনিবার তড়িঘড়ি সুপ্রিম কোর্টে ক্যাভিয়েট দাখিল করেন রাজ্যের আইনজীবী কুণাল মিমানি। আইনি পরিভাষায় ক্যাভিয়েট দাখিল করার অর্থ হলো, কোনও পক্ষ যদি মামলা করে, তবে অপর পক্ষকে (রাজ্য সরকারকে) নোটিশ না দিয়ে বা তাদের বক্তব্য না শুনে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বা স্থগিতাদেশ দেওয়া যাবে না।
ইডি এখন চাইছে এই মামলা CBI-কে দেওয়া হোক।
ইডির পাল্টা যুক্তি ও অভিযোগের তীর
আদালতে পেশ করা প্রাথমিক আবেদনে ইডি অত্যন্ত বিস্ফোরক কিছু দাবি করেছে:
তদন্তে বাধা: তল্লাশি চলাকালীন পুলিস ও প্রশাসনিক কর্তাদের উপস্থিতি তদন্তকারীদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করেছে।
নথি সরানো: মুখ্যমন্ত্রীর হাতে দেখা যাওয়া সেই সবুজ ফাইলের রহস্য উদঘাটন করতে চায় ইডি। তাদের দাবি, ওই ফাইলে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে।
পুলিসের ওপর অনাস্থা: ইডির দাবি, রাজ্য পুলিস কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে তল্লাশিতে বাধার সৃষ্টি করেছে, এমনকি পালটা এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। এই কারণে তারা এই ঘটনার সিবিআই তদন্তের দাবি জানাচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই লড়াই এখন আর কেবল একটি কয়লা পাচার মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বনাম কেন্দ্রীয় এজেন্সির লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস এটিকে ‘ভোটের আগে ভয় দেখানোর রাজনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করছে, অন্যদিকে বিজেপি একে ‘দুর্নীতি ঢাকতে মুখ্যমন্ত্রীর মরিয়া চেষ্টা’ বলে আক্রমণ শানাচ্ছে।
আগামী সম্ভাবনা
শনিবার রাজ্যের ক্যাভিয়েট দাখিলের ফলে সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আঙিনা অত্যন্ত উত্তপ্ত থাকতে চলেছে। যদি সোমবার ইডি মামলা ফাইল করে, তবে আদালতকে প্রথমেই ক্যাভিয়েটর অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বক্তব্য শুনতে হবে। অন্যদিকে, ১৪ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টে কী ঘটে, সেদিকেও নজর থাকবে তামাম রাজনৈতিক মহলের।
আইপ্যাক মামলা এখন আর কেবল আইনি দস্তাবেজ নয়, বরং বাংলার আগামী নির্বাচনের আগে একটি বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবুজ ফাইলের রহস্য কিংবা ইডির হাতে থাকা তথ্যের সত্যতা—সবটাই এখন আদালতের বিচারাধীন।