রাজ্য সরকারের একগুচ্ছ প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তবে উপযুক্ত কর্মসংস্থান কোথায়? কাজ হারিয়ে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন বাঁকুড়ার শালতোড়া এলাকার বাসিন্দারা। কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন এই এলাকার পাথর খাদান শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক। জনসাধারণের নাড়ির টান বুঝে শনিবার শালতোড়ার সভা থেকেই বড় ঘোষণা করলেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। স্থানীয়দের আশ্বাস দিলেন, ৩১ মার্চের মধ্যেই বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা খাদান চালু হবে। ‘কথা রাখলে আমরা খুশি হব’, বক্তব্য শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের। এ সব প্রতিশ্রুতি ভোটের আগে ‘লোক দেখানো’ বলে পাল্টা আক্রমণ বিজেপির।
বাঁকুড়ার শালতোড়ায় কেন সভা করার জন্য জায়গা বেছে নিলেন অভিষেক? মঞ্চ থেকেই সেই উত্তর দিয়ে অভিষেক বলেন, ‘আমি গত দু’মাস ধরে এর (পাথর খাদান চালু সংক্রান্ত কাজ) উপর কাজ করেছি। আজ সকালেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ৩১ মার্চের মধ্যে ১৮টি খাদান চালু করা হবে। সব খাদান চালু হয়ে গেলে ২৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। কথা দিয়ে কথা রাখার নাম তৃণমূল।’ অভিষেক মনে করিয়ে দেন, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে ‘নবজোয়ার’ কর্মসূচিতে শালতোড়ায় এসেছিলেন। তখনই স্থানীয়রা খাদান শিল্পের দুরাবস্থার কথা তুলে ধরেন অভিষেকের কাছে।
রুক্ষ বাঁকুড়া জেলার সবথেকে ‘অনুর্বর’ ব্লক হিসেবে পরিচিত শালতোড়া। কিন্তু এই শালতোড়ার মাটির নীচেই লুকিয়ে রয়েছে থরে থরে কালো পাথর। এক কালে এই পাথরের উপর নির্ভর করেই শালতোড়ায় রমরমিয়ে চলত প্রায় ২৫০টি পাথর ভাঙার ক্রাশার। এলাকার প্রায় ২০ হাজার শ্রমিকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জীবন ও জীবিকা চলত এই ক্রাশারগুলির উপর নির্ভর করে। বীরভূমের রামপুরহাট ও পাঁচামির সঙ্গে সমানে সমানে টেক্কা দিত শালতোড়ার পাথর ভাঙা শিল্প। কিন্তু অধিকাংশ পাথর খাদানের বৈধ অনুমতি নেই এই অভিযোগে ২০২১ সালে রাজ্য সরকার শালতোড়ায় পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। কাঁচামালের অভাবে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় সবকটি ক্রাশার। পাথর খাদানগুলির বৈধ অনুমতির দাবিতে ক্রাশার মালিক থেকে শ্রমিকরা দীর্ঘ আন্দোলন চালালেও শেষ পর্যন্ত হতাশ শ্রমিকেরা পেটের টানে পাড়ি জমান ভিন রাজ্যে অথবা ভিন জেলায়। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করতে ছাড়েনি গেরুয়া শিবির।
তবে, নিয়ম মেনে খাদান চালু করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অসহযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে পাল্টা এ দিন অভিযোগ করেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘একটি খাদান করতে গেলে অন্তত এক হেক্টর জমির প্রয়োজন হয়। একাধিক সরকারি অনুমতির দরকার হয়। ডাইরেক্টর জেনারেল অফ মাইনিং-এর এনওসি পেতে গেলে মাসের পর মাস সময় লাগে। আইনি প্রক্রিয়া মেনে যদি খাদান চালুও করতে হয়, ৩০-৩২ লক্ষ জমা দিতে হয়।’
এলাকার বিধায়ক-সাংসদরা বিজেপির হলেও কেন কোনও পদক্ষেপ করেনি? খোঁচা অভিষেকের। তাঁর বক্তব্য, ‘শালতোড়ার বিধায়ক বিজেপির। ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাংসদ ছিল বিজেপির। আমি জিজ্ঞেস করি বিধায়ক-সাংসদদের, লজ্জা লাগে না! কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থাকে ঘুষ দিতে মানুষকে নিজেদের অধিকারের স্বার্থে লড়তে হয়। তখন এদের বড় বড় ভাষণ কোথায় থাকে!’
পাল্টা বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খান বলেন, ‘শালতোড়ার গরিব মানুষদের ওঁরা মেরেছেন। ওখানে যে পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয় ওটা কেন্দ্রীয় সরকারের। পাথর শিল্প এখানে ৭০ বছর ধরে চলছে। তৃণমূল কংগ্রেস এটা বন্ধ করে দিয়েছিল। বাঁকুড়া জেলার পাথর, বালি এলাকার লোক পাচ্ছেন না, বড় বড় ট্রাক এনে কলকাতায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। কে নিয়ে যাচ্ছে?’
তবে, অভিষেকের ঘোষণায় খুশি স্থানীয় বাসিন্দারা। সুধীর মণ্ডল নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘সত্যিই যদি এটা হয়, এর থেকে খুশির কিছু নেই। মানুষ কাজ না পেয়ে বাইরে চলে গিয়েছে। এখানে চাষাবাদ কিছু হয় না। পাথর খাদানের কাজ শুরু হলে মানুষ কাজ করে খেতে পাবেন। আমরা এই সিদ্ধান্তে খুব খুশি।’ আরেক বাসিন্দা অভিরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা খুবই খুশি। তবে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করি। যদি খাদান খুলে যায়, আমরা খুবই উপকৃত হব।’