আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে আসন্ন নির্বাচন এক দফাতেই অনুষ্ঠিত হওয়ার ইঙ্গিতের মধ্যেই বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (Special Intensive Revision – SIR) ঘিরে বড় সিদ্ধান্ত নিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। ক্রমবর্ধমান অভিযোগ ও তথ্যগত অসঙ্গতির প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গে ফের নতুন করে চারজন স্পেশাল রোল অবজারভার নিয়োগ করা হলো।
নিয়োগপ্রাপ্ত আধিকারিকরা হলেন, রতন বিশ্বাস, সন্দীপ রেওয়াজী রাঠোর, ডঃ শৈলেন এবং বিকাশ সিং। তাঁরা প্রত্যেকেই আইএএস পদমর্যাদার আধিকারিক। এর ফলে সুব্রত গুপ্ত-সহ রাজ্যে মোট স্পেশাল রোল অবজারভারের সংখ্যা দাঁড়াল ২২ জন।
যে এলাকায় বেশি অভিযোগ, সেখানেই নজরদারি
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, যেসব এলাকায় ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে, সেখানেই এই অবজারভাররা সরেজমিনে গিয়ে নজরদারি করবেন। পাশাপাশি শুনানি সংক্রান্ত ফর্ম, নথি ও তথ্য জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই বা ‘চেকিং’-এর দায়িত্বেও থাকবেন তাঁরা। বিশেষ করে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক তথ্যগত অসঙ্গতির তালিকা খতিয়ে দেখাই তাঁদের মূল কাজ।
SIR নিয়ে রাজ্যের আপত্তি, কমিশনকে মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি
এদিকে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্যবাসীর ভোগান্তির অভিযোগ তুলে ফের জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, SIR প্রক্রিয়ার নামে মানুষকে অকারণে হয়রানি করা হচ্ছে। অসুস্থ ব্যক্তিদের জোর করে শুনানি কেন্দ্রে ডাকা হচ্ছে, বিবাহিত মহিলারাও নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন।
এই ইস্যুতেই বুধবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তরে যান তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ পার্থ ভৌমিক, মন্ত্রী শশী পাঁজা-সহ পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। তাঁরা সিইও মনোজ আগরওয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দলের পক্ষ থেকে আপত্তি ও অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন।
ডেটা এন্ট্রি অপারেটর সংকটেই গতি কমছে
নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটার অন্যতম কারণ ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের ঘাটতি। এই বিষয়ে বারবার রাজ্যের ফিনান্স ডিভিশনের কাছে আবেদন জানানো হলেও পশ্চিমবঙ্গে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা মেলেনি। কমিশনের দাবি, অন্য রাজ্যে যেখানে এই সহযোগিতা পাওয়া গেছে, সেখানে বাংলায় তা সম্ভব হয়নি।
ভুলের দায় কার? আঙুল BLO, ERO ও AERO-দের দিকে
শুনানি সংক্রান্ত ভুলত্রুটির জন্য বুথ লেভেল অফিসার (BLO)-দের দায়ী করেছে নির্বাচন কমিশন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় তাঁদের গাফিলতির পাশাপাশি ERO ও AERO আধিকারিকদের পর্যবেক্ষণের ঘাটতির কথাও স্বীকার করা হয়েছে। কমিশনের মতে, যথাযথ নজরদারি থাকলে এত বিপুল ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ তৈরি হতো না।
৩২ লক্ষ শুনানি শেষ, বাকি ৯৪ লক্ষ নিয়ে বিতর্ক
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩২ লক্ষ ‘আনম্যাপড’ শুনানির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে বাকি রয়েছে প্রায় ৯৪ লক্ষ ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ সংক্রান্ত মামলা। কমিশনের দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এই কাজ শেষ করা সম্ভব। যদিও এই নিয়ে তৃণমূলের প্রতিনিধিদল তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে এত অল্প সময়ে কাজ শেষ করা কার্যত অসম্ভব।
হাইরাইজ আবাসনে নতুন বুথ
এছাড়াও কমিশন জানিয়েছে, যেসব বেসরকারি আবাসনে ৩০০-র বেশি ভোটার রয়েছেন, সেখানে আলাদা করে হাইরাইজ বুথ তৈরি করা হবে। আপাতত রাজ্যের সাতটি জেলায় মোট ৬৯টি বুথ চিহ্নিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেই ইঙ্গিত নির্বাচন কমিশনের।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তরের দাবি অন্য রাজ্যে যদি এক দফায় নির্বাচন সম্ভব হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে কেন নয়? কাজেই পশ্চিমবঙ্গে এক দফায় নির্বাচন হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত ও প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন। পাশাপাশি এক দফায় নির্বাচন হলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রয়োজনও তুলনামূলকভাবে কম হবে বলে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে রাজ্য-কমিশন সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে। স্পেশাল রোল অবজারভার নিয়োগে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।