নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ডালহৌসি মানে কংক্রিটেরই জঙ্গল। বিশাল সব ইমারত। পিচরাস্তা। সেই ডালহৌসি বা বিবাদী বাগে ফুলকপি চাষ চলছে! মস্করা হচ্ছে? ওখানে কৃষিযোগ্য জমি আছেটা কোথায় শুনি?
না, মোটেও মস্করা নয়। হাইকোর্টের গলিতে ঢোকার মুখে যে সেন্ট জনস চার্চ, যেখানে জোব চার্নকের সমাধি রয়েছে, সেই গির্জার জমিতে শীতে চাষ হচ্ছে ফুলকপি। এখন বেশ ডুমো ডুমো সাইজ। আর একটু বড়ো হলেই খেয়ে ফেলার জন্য তোলা হবে।
এখন ডালহৌসি মানে ইট-কাঠের জঙ্গল। তবে এককালে তো তা ছিল না। এককালে মানে প্রায় ২৭৫ বছর আগে এখানে চাষ শুরু হয়েছিল। এ চত্বর তখন জঙ্গল। বিনয়কৃষ্ণ দেব বাহাদুরের লেখা বইয়ে মেলে, ‘পেরিন্স্ পয়েণ্ট হইতে লালবাজার রোড পর্যন্ত সমস্ত শহরে ইষ্টকালয়ের চিহ্ন অঙ্কিত, এবং ১৭৪২ অব্দের মানচিত্রে যেস্থান জঙ্গলময় ছিল, সেখানে এখন লোকালয়ের চিহ্ন অঙ্কিত। আরও দেখা যায় যে, পুষ্পোদ্যান ও ফলোদ্যান নির্মাণের উপযুক্ত জমিসকল চিহ্নিত এবং জঙ্গল বহুপরিমাণ বিলুপ্ত হইয়াছে।’ লেখাটি পড়ে বোঝা যায়, লালবাজার চত্বরে সে সময় ফল ও ফুল চাষ শুরু করছে ইংরেজরা। আর বিনয় ঘোষের লেখা থেকে চাষাবাদের একটি ইঙ্গিত মেলে। সেটি হল, গঙ্গার ধারে কর্নেল ওয়াটসন নামে এক সাহেব ডক তৈরির সময় একটি উইন্ডমিল বসিয়েছিল। সেটির উপরের তলায় ছিল শস্য পেষাইয়ের ব্যবস্থা। এ থেকে আন্দাজ করা যায় যে, সে সময় এখানে শস্য পেষাইয়ের প্রয়োজন পড়ত। অর্থাৎ চাষবাদ হত। সেই ডালহৌসিতে ২০২৬ সালেও চলছে চাষ।
সেন্ট জনস চার্চ বিশাল চত্বরজুড়ে ছড়িয়ে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বহু বিখ্যাত ব্রিটিশের সমাধি। গাছগাছালিতে ভর্তি। সর্বক্ষণ পাখিদের কিচিরমিচির। দিনেদুপুরে কাঠবিড়ালি ঘোরে। ফুল ফোটে প্রচুর। তারই ফাঁকে সযত্নে ফলছে ফুলকপি। যত্ন নিয়ে চাষ করছেন মালিরা। ‘কলকাতার মাটি কেমন?’ ‘এখানকার ফুলকপি খেতে কি নদীয়ার মদনপুরের থেকেও ভালো?’ প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ব্যতিব্যস্ত চার্চ কর্তৃপক্ষ। মালিরা শহরের মানুষের এসব প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসেন।
চার্চের কর্মীদের বক্তব্য, জায়গাটি সাফসুতরো রাখতে বাগান তৈরি করা হয়েছে। বহু প্রাচীন গাছ আছে, কাঁঠাল, বেল, জাম, আম, নারকেল ইত্যাদি। আর বসানো হয়েছে গোলাপ, লিলি-ক্যালেন্ডুলা, পিটুনিয়া, অ্যাল্টানিয়াম, অ্যাস্টর, গাঁদাফুল। আটজন মালি এসবের পরিচর্যায় নিযুক্ত। তাঁরাই চাষ করেন। কাঠবিড়ালিদের খেতে দেন। পাখিদের জন্য ছোট বাসা তৈরি করা আছে। তাদের দানা খাওয়ান।
তবে শুধু জায়গা সাফ রাখা নয়, আনাজ উৎপাদনের একটি ধর্মীয় উদ্দেশ্যও আছে। সেন্ট জনসে জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি নাগাদ হয় ‘হারভেস্ট ফেস্টিভ্যাল’। সে উৎসবে ঈশ্বরের বেদীতে দেওয়া হয় চার্চের বাগানের ফুলকপি। যিশুকে নিবেদনের পর আনাজ নিলাম হয়। সামান্য টাকায় তা কেনেন চার্চেরই কোনও কর্মী। ফলে সে কপির কেমন স্বাদ তা শুধু গির্জার কর্মীরাই জানেন। ঈশ্বরের বাগানের সব্জির স্বাদ সবার জন্য নয়।