• মা-বাবার মৃত্যুর পর এবার আজীবন ফ্যামিলি পেনশন পাবে ডিভোর্সী মেয়েও! কলকাতা হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়...
    ২৪ ঘন্টা | ১১ জানুয়ারি ২০২৬
  • জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিবাহবিচ্ছিন্না কন্যার মা-বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক পেনশন পাওয়া নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের এক যুগান্তকারী রায়।

    সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুর পর তাঁর বিবাহবিচ্ছিন্না কন্যা পারিবারিক পেনশন পাওয়ার যোগ্য কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটাতে এক তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যদি কোনও কন্যার বিবাহবিচ্ছেদের মামলা পেনশনভোগীর জীবদ্দশায় শুরু হয়ে থাকে, তবে চূড়ান্ত ডিভোর্স ডিক্রি বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরে এলেও তিনি পারিবারিক পেনশন পাওয়ার অধিকারী হবেন।

    মামলার প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই

    সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (CAT)-এর একটি নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল এর আগে এক বিবাহবিচ্ছিন্না কন্যাকে পারিবারিক পেনশন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি ছিল, সংশ্লিষ্ট মহিলার বিবাহবিচ্ছেদের চূড়ান্ত রায় (Decree) তাঁর বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কার্যকর হয়েছে, তাই নিয়মানুযায়ী তিনি পেনশন পাওয়ার যোগ্য নন।

    তবে কলকাতা হাইকোর্ট এই যুক্তি খারিজ করে দিয়ে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশই বহাল রেখেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, পারিবারিক পেনশনের মূল উদ্দেশ্য হলো মৃত কর্মচারীর ওপর নির্ভরশীল সদস্যদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

    আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নতুন নির্দেশিকা

    বিচারপতিদের ডিভিশন বেঞ্চ তাঁদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে, ১৯ জুলাই ২০১৭-এর একটি অফিস মেমোরেন্ডাম অনুযায়ী, চূড়ান্ত বিচ্ছেদ কখন হলো তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচ্ছেদের প্রক্রিয়াটি কবে শুরু হয়েছিল। যদি কোনো বিবাহবিচ্ছেদের মামলা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারী বা পেনশনভোগীর জীবদ্দশায় সক্ষম আদালতে দায়ের করা হয়, তবে ওই কন্যাকে পরিবারের অংশ হিসেবেই গণ্য করতে হবে। এমনকি যদি বিচ্ছেদের চূড়ান্ত রায় বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরে আসে, তবুও পেনশনের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে না।

    আদালত আরও মনে করিয়ে দেয় যে, ডিভোর্স হওয়া মানেই সেই নারী তাঁর পিতৃগৃহের ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের বিবাদ বা আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে যদি রায় আসতে দেরি হয়, তবে তার জন্য ওই আবেদনকারীকে পেনশনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা সংবিধানের কল্যানমূলক রাষ্ট্রের ধারণার পরিপন্থী।

    যোগ্যতার অন্যান্য শর্তাবলী

    তবে এই রায় পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে আরও কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে: ১. আর্থিক নির্ভরশীলতা: আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি তাঁর প্রয়াত বাবা বা মায়ের ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। তাঁর নিজস্ব আয় নির্দিষ্ট সীমার (সাধারণত ৩,৫০০ টাকা + মহার্ঘ ভাতা) নিচে হতে হবে। ২. সময়সীমা: ডিভোর্স বা বিচ্ছেদের আবেদনটি অবশ্যই পেনশনভোগীর জীবদ্দশায় দায়ের হতে হবে। ৩. বিচ্ছেদের তারিখ: পারিবারিক পেনশন বিচ্ছেদের চূড়ান্ত রায় পাওয়ার দিন থেকে কার্যকর হবে।

    সামাজিক গুরুত্ব

    আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় পশ্চিমবঙ্গসহ সারা দেশের অসংখ্য অসহায় ও বিবাহবিচ্ছিন্না নারীর জন্য আশার আলো দেখাবে। অনেক ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। মামলার মাঝপথেই যদি বাবা-মায়ের মৃত্যু হয়, তবে অনেক নারীই চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। কলকাতা হাইকোর্টের এই মানবিক ব্যাখ্যা সেই সমস্ত নারীর আইনি ও সামাজিক সুরক্ষাকে আরও মজবুত করল।

    পরিশেষে, আদালত সরকারের এই মানসিকতার সমালোচনা করেছে যেখানে যান্ত্রিক নিয়মকে বড় করে দেখিয়ে সামাজিক সুরক্ষামূলক প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। এই রায়ের ফলে এখন থেকে বিবাহবিচ্ছিন্না কন্যারা মাথা উঁচু করে বাঁচার এক নতুন মাধ্যম খুঁজে পাবেন।

     

  • Link to this news (২৪ ঘন্টা)