• শতবর্ষে হাওড়ার ‘বড়ো ঘড়ি’, নথিই নেই রেলের কাছে
    বর্তমান | ১২ জানুয়ারি ২০২৬
  • সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: ‘বড়ো ঘড়ির নীচে দাঁড়াস। ওখানেই আসছি।’ শক্তি, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সত্যজিৎ—সাহিত্যের পাতা থেকে আম বাঙালির দৈনন্দিন যাপনে এভাবেই জড়িয়ে গিয়েছে হাওড়া স্টেশনের ‘বড়ো ঘড়ি’। ১৯২৬ সাল। স্টিম ইঞ্জিনের রাজত্ব। হাওড়া স্টেশনের দেওয়ালে বসানো হল ৩ ফুট ৯ ইঞ্চি ডায়ালের প্রকাণ্ড সাদা-কালো ঘড়ি। সেই থেকে আজও ভিড়ে ঠাসা স্টেশন চত্বরে  প্রিয়জনকে খুঁজে পাওয়ার সহজতম ‘ল্যান্ডমার্ক’ এটাই। এহেন ‘বড়ো ঘড়ি’র জন্ম সাল জানা থাকলেও কেউ জানে না তার জন্মদিন কবে! রেলের কাছে এ সংক্রান্ত কোনও নথিই নেই। ২০২৬-এ শতবর্ষে পদার্পণ করছে ‘বৃদ্ধ’ ঘড়ি। তাই জন্মদিন না জানা থাকলেও রেলযাত্রী থেকে আম জনতার উৎসাহের কমতি নেই। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ট্রেনের কামরা মেতে উঠেছে শতায়ু ঘড়ির স্মৃতিচারণে। 

    রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, ব্রিটিশ কোম্পানি ‘জেন্টস’ এই কিংবদন্তি ঘড়িটি তৈরি করে। ১৯২৬ সালে স্টেশন ম্যানেজারের ঘরের পাশে দেওয়ালে ভারী লোহার ফ্রেমের উপর বসানো হয় এটি। কাজটি সুসম্পন্ন করেন কলকাতার বিখ্যাত ঘড়ি ব্যবসায়ী দেবপ্রসাদ রায়। প্রথম দিকে ঘড়িটি দূরনিয়ন্ত্রক পালসার যন্ত্রের মাধ্যমে নিয়মিত দম দেওয়া হত। ১৯৭৫ সালে মেকানিক্যাল থেকে ইলেকট্রো-মেকানিক্যালে বদলে ফেলা ঘড়িটি। বর্তমানে রিচার্জেবল ব্যাটারির সাহায্যেই এটি চালু রাখা হয়েছে। গত ১০০ বছর ধরে কত মানুষ যে নিজের হাতঘড়ির সময় মিলিয়ে নিয়েছেন ‘বড়ো ঘড়ি’ দেখে, তার ইয়ত্তা নেই। 

    স্বভাবতই জন্ম শতবর্ষে নেট দুনিয়া থেকে নিত্যযাত্রীদের খোশগল্পে ফিরে ফিরে আসছে তার প্রসঙ্গ। ‘বড়ো ঘড়ি’ এখন রীতিমতো সেলিব্রিটি! নস্টালজিক হয়ে পড়ছেন অনেকে। ‘শতায়ু বৃদ্ধের’ সঙ্গে জুড়ে থাকা নানা স্মৃতি তুলে ধরছেন সামাজিক মাধ্যমের দেওয়ালে। তবে সবার একটাই খেদ, যদি জন্মদিনটা জানা যেত, ধুমধাম করে বার্থ ডে সেলিব্রেশনও করা যেত! 

    রেল বলছে, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখতে হবে। হাওড়া শহরের পুরানো নথিপত্র জোগাড় করে গবেষণা করেন ডাঃ সুকান্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি বলছিলেন, ‘কাগজপত্র ও শ্রুতিকথার ভিত্তিতে ইতিহাসের পুনরুদ্ধার সম্ভব। গ্রামীণ সমীক্ষার কাজে শ্রুতি খুবই কার্যকরী। কিন্তু শহরের ইতিহাস জানতে ওয়ার্ক অর্ডারের মতো সরকারি নথির উপর নির্ভরশীল হতে হয়।’ বহু জায়গায় খুঁজেও ঐতিহ্যবাহী ‘বড়ো ঘড়ি’ সংক্রান্ত কোনও প্রামাণ্য নথি তিনি পাননি। তাঁর কথায়, ‘হাওড়া কর্পোরেশনের কাছে সম্ভবত এ সংক্রান্ত তথ্য রাখা ছিল। কিন্তু নতুন বিল্ডিং তৈরির সময় প্রচুর নথিপত্র, পুরানো বই বিক্রি করে দেওয়া হয়। তখনই সম্ভবত ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে বড়ো ঘড়ির ইতিহাস।’ এখনও এই ঘড়ির নীচে ধাতব প্লেটে ব্রিটিশ আর্মির বিভিন্ন রেজিমেন্টের রেলকর্মী ও সেনা সদস্যদের নাম রয়েছে। তাঁরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু ঘড়ির ইতিহাস বা দিনক্ষণ উল্লেখ নেই কোথাও। হাওড়া-আমতা শাখার নিত্যযাত্রী দেবাশিস কোলে, স্বপন সরকার বলেন, ‘ছোটোবেলা থেকেই হাওড়া স্টেশনের বড়ো ঘড়ি আমাদের ল্যান্ডমার্ক। এর ইতিহাস মানুষকে জানানোর ব্যবস্থা করুক রেল।’  
  • Link to this news (বর্তমান)