সুস্বাদু সন্দেশকে সুদর্শন করে তুলছেন ছাঁচ শিল্পীরা, রবীন্দ্র সরণির গুটিকয়েক দোকান রক্ষা করছে ঐতিহ্য
বর্তমান | ১২ জানুয়ারি ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শীত পড়েছে। মিষ্টির দোকানে উঁকি দিচ্ছে নতুন গুড়ের, নানা মাপের, নানা রূপের সন্দেশ। ছানা জ্বাল দিয়ে বিশাল বড় কাঠের থালায় মেখে ছাঁচে ফেললে তবে তৈরি হয় অপূর্ব দেখতে সব সন্দেশ। সেই যে মিষ্টির ছাঁচ তা তৈরি হয় এই শহর কলকাতাতেই। রবীন্দ্র সরণিতে লাইন দিয়ে এরকম বেশ কয়েকটি দোকান রয়েছে। ছোট, পুরনো সব দোকান। সেখানে মোটা ফ্রেমের চশমা চোখে এক মনে কাজ করেন শিল্পীরা। সেগুন কাঠের ছোট্ট ছাঁচ। সেগুলিতে ফেলে তৈরি হয় সন্দেশের মুখশ্রী। সুস্বাদু সন্দেশ দেখতে হয়ে ওঠে সুদর্শন। রবীন্দ্র সরণির দোকানগুলিতে এককালে কাঠের ছাঁচই তৈরি হতো শুধু। এখন কিছু জায়গায় কাঠের বদলে তৈরি হয় ফাইবারের ছাঁচ। তবে সেগুলি কাঠের বিকল্প কোনওভাবেই নয়। নামকরা কুলীন মিষ্টির দোকানগুলির এখনও প্রথম পছন্দ কাঠ দিয়ে তৈরি ছাঁচ। শীতের দুপুরে রোদ এসে পড়ে পুরনো দোকানগুলির কালচে দেওয়ালে। সে রোদ ছায়া আঁকে। ছায়াটি সেই শিল্পীর, যিনি হাতে কাঠ কাটার যন্ত্র নিয়ে একমনে কাজ করে চলেছেন। তাঁর নাম, ভোলানাথ দাস। কিছুক্ষণ আগেই বাটালি দিয়ে কাঠের চাকতির উপর ফুল এঁকেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘শুভ উপনয়ন’। এবার চাকতিটি সমান আকারে গোল করার পালা। সে কাজ শেষ হওয়ার পর চোখ তুলে তাকালেন। বললেন, ‘আমি ছ’বছর বয়সে কাজ শিখতে শুরু করি। প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেল ছাঁচ তৈরি করছি। সাধারণত সেগুন কাঠ দিয়েই তৈরি হয় মিষ্টির ছাঁচ।’ একটি ছাঁচ কতদিন ব্যবহার করা যায়? ভোলানাথের কথায়, ‘ছাঁচের উপর ছাপ কতদিন স্পষ্ট থাকে তার উপর বিষয়টি নির্ভর করে। যতদিন নকশা স্পষ্ট থাকবে, ততদিনই আয়ু।’
ভোলানাথবাবুর বাবা একসময় শুধু এই ছাঁচ তৈরির ব্যবসাই করতেন। পরবর্তীকালে কাঠের পিঁড়ি ইত্যাদি সরঞ্জামও তৈরি শুরু করেন। এই দোকানের পাশেই মডার্ন আর্ট সেন্টার। স্থানীয়রা বলেন, এই দোকান বহুদিনের পুরনো। দোকানের জীর্ণ সাইনবোর্ডে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে ‘সন্দেশের ছাঁচ’ লেখাটি। হিন্দিতেও লেখা ‘মিঠাই কা ছাপা’। টিমটিমে আলো জ্বলে দোকানে। দু’জন বসে একমনে কাজ করেন। কাঠের উপর আগে পেন্সিল দিয়ে লিখে নিতে হয়। তারপর সুক্ষ্ম হাতে বাটালি কেটে ছাপ ফোটানোর কাজ। শুধু তো লেখা নয়, আম, লিচু, শাঁখের আদলেও ছাঁচ হয়। মর্ডান আর্ট সেন্টারে কাজ করতে করতে দুই শিল্পী বললেন, ‘প্রায় ৭০ বছরের দোকান। সন্দেশের ছাঁচের চাহিদা সামান্য কমলেও এখনও মন্দ নয়। বিয়ের সিজনে কাজের চাপ খুব বেড়ে যায়।’ এর দাম শুরু ৭০ থেকে। দেড়-দু’হাজার টাকা দামের বড় ছাঁচও বিক্রি হয়। ধীরে সেগুন কাঠের জগতে ঢুকে পড়েছে প্লাস্টিক, ফাইবার। তবে তাতে মনের মতো ডিজাইন ফোটে না। ফলে এখনও শহর কলকাতার মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠানগুলির ভরসার অন্যতম জায়গা এই রবীন্দ্র সরণি। সেখানে জীর্ণ দোকানে বসে বাঙালির বিভিন্ন উত্সব সুদর্শন করে তোলেন শিল্পীরা। তাঁদের আঙুলের ছোঁয়ায় অপরূপ সুন্দর গঠন পায় সন্দেশ। দেখতে ভালো না হলে খেতে মজা নেই। পেহলে দর্শনধারী, বাদ মে গুণ