• মোবাইল, দামের জাঁতাকলে পৌষ পার্বণে অতীত 'নারকেল লড়াই'
    এই সময় | ১২ জানুয়ারি ২০২৬
  • সমীর মণ্ডল, মেদিনীপুর

    মোবাইলের প্রতি ক্রমবর্ধমান আসক্তি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বেলাগাম মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতিতেও। একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার নানা খেলাধূলা থেকে লোকায়ত আয়োজন। তারই অন্যতম মেদিনীপুরের কেশপুর ব্লকের আনন্দপুরের ঐতিহ্যবাহী 'নারকেল লড়াই'।

    মকর পরব এলেই, পৌষ সংক্রান্তির আগে টানা সাত দিন ধরে চলত এই অভিনব গ্রাম্যক্রীড়া। গ্রামের মানুষজন দলবেঁধে জড়ো হতেন আনন্দপুর চালাকির মোড়ে। কেউ খেলায় অংশ নিতেন, কেউ আবার দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতেন এই লড়াই। দিনের শেষে কেউ বাড়ি ফিরতেন কয়েকটি নারকেল জিতে। কেউ ফিরতেন খেলায় আনা নারকেল হারিয়ে খালি হাতে। তবে দিনের শেষে সকলেই বাড়ি ফিরতেন আনন্দ, উত্তেজনা আর গ্রামবাংলার এমন মিলন মেলার এক অনন্য ছবি বুকে নিয়ে।

    এক সময় এই নারকেল লড়াই দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ জড়ো হতেন। মকর পরবের আনন্দ যেন কয়েক গুণ বেড়ে যেত এই খেলাকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম বাংলার আর পাঁচটা লৌকিক খেলার মতোই হারিয়ে যেতে বসেছে 'নারকেল লড়াই'। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, এখন আর এই খেলায় আগ্রহ দেখানোর মতো মানুষ নেই। মোবাইল ফোনে ডুবে থাকা ব্যস্ত জীবনে কারও হাতে সময় নেই। তার উপর নারকেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় খেলার আয়োজন করাও ক্রমশ কঠিন হয়েছে। আনন্দপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত তিন বছর ধরে এই খেলা পুরোপুরি বন্ধ। মোরগ লড়াই, বুলবুলি পাখির লড়াই বা পুরুলিয়ার মোষের লড়াইয়ের কথা জানা আছে অনেকেরই।

    কিন্তু 'নারকেল লড়াই'-এর নাম শুনে অনেকের প্রশ্ন জাগে, এমন খেলাও কি ছিল? আনন্দপুর রাজারডাঙার প্রবীণ বাসিন্দা সোনু খান বলেন, 'একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে দু'পাশ থেকে জোরে গড়িয়ে দেওয়া হতো দু'টি নারকেল। যতক্ষণ না একটি নারকেল ফেটে যাচ্ছে, ততক্ষণ চলত খেলা। যার নারকেল আগে ফেটে যেত, সে হে রে যেত। আর বিজয়ী পেত পরাজিতের ফাটা নারকেল। খুব সহজ, অথচ দারুণ মজার খেলা ছিল।' তাঁর আক্ষেপ, 'এখন আর এই খেলায় কেউ আসতে চায় না। সবাই ব্যস্ত ফোনে। তার উপর নারকেলের দামও আঁকাড়া।' আনন্দপুর চালাকির মোড়ে দাঁড়িয়ে শেখ রমজান বলেন, 'আগে নারকেল লড়াই মানেই ছিল আনন্দ। এখন মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। তার উপর নারকেলের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। আগে যেখানে পাঁচ-দশ টাকায় বড় নারকেল পাওয়া যেত। এখন সেখানে গুনতে হচ্ছে ৪০-৫০, এমনকী ৬০ টাকা। এত খরচ করে কে আর খেলতে আসবে?'

    লেখক ও গোদাপিয়াশাল হাই স্কুলের শিক্ষক মণিকাঞ্চন রায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'এরকম বহু গ্রামীণ ও লোকজ খেলা ইতিমধ্যেই হারিয়ে গিয়েছে। আনন্দপুরের 'নারকেল লড়াই' বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর সত্যিই বেদনাদায়ক। গাদি, কিতকিত, নুন ধাপসা, চিনি-বিস্কুটের মতো খেলাগুলির সঙ্গে সঙ্গে এই সব আঞ্চলিক খেলাও হারিয়ে গেল। এটা আমাদের সংস্কৃতির পক্ষে মোটেও সুখকর নয়।'

    সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া একদা 'নারকেল লড়াই' তাই শুধু একটি খেলা নয়। গ্রামবাংলার সামাজিক বন্ধন ও আনন্দের পাশাপাশি লোকসংস্কৃতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

  • Link to this news (এই সময়)