• সংবিধান ও আম্বেদকর নিয়ে কুকথা: তদন্ত ‘অমীমাংসিত’, জমা পড়ল ফ্যাক্ট–ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্ট
    এই সময় | ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সংবিধান–বিতর্ক ও ‘ভারতীয় সংবিধানের জনক’ বিআর আম্বেদকরকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের যে অভিযোগ উঠেছিল, সেই ঘটনার তদন্ত রিপোর্টে কোনও দিশা পাওয়া গেল না। দীর্ঘ টানাপড়েনের পরে পাঁচ সদস্যের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি তাদের রিপোর্ট জেইউয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের কাছে সম্প্রতি জমা দিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। অভিযোগের সত্যতা নিয়ে রিপোর্টে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কমিটির মতে, পুরো বিষয়টিই বর্তমানে ‘অমীমাংসিত’ অবস্থায় রয়েছে। তার জন্য এই রিপোর্ট ঘিরেই এখন নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ তদন্তের এই ফল তারা সরাসরি দিল্লিতে জাতীয় তফসিলি জাতি কমিশনের কাছে পাঠাবেন।

    ঘটনার সূত্রপাত, পলিটিক্যাল সায়েন্স (বিভাগের নাম যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, স্নাতকোত্তরেও তা–ই)–এর স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। ওই ছাত্রীর দাবি ছিল, বিভাগের এক অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর সংবিধানের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই শিক্ষক কথা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন যে, সংবিধানকে ছিঁড়ে জলে ফেলে দেওয়া উচিত। শুধু তা–ই নয়, ‘ভারতীয় সংবিধানের জনক’ বিআর আম্বেদকর সম্পর্কেও তিনি কুরুচিকর আক্রমণ করেন বলে ওই ছাত্রীর অভিযোগ।

    বিষয়টির সংবেদনশীলতা বিচার করে গত ১৬ ডিসেম্বর ওই বিভাগেরই পাঁচ জন শিক্ষককে নিয়ে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির মূল কাজ ছিল, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, রিপোর্ট জমা পড়ার পরে দেখা যাচ্ছে, তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়ে কিছু জানাতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক এই প্রসঙ্গে জানান যে, অভিযোগকারী ছাত্রী এবং অভিযুক্ত শিক্ষক— দু’জনেই নিজের নিজের অবস্থানে অনড়। সওয়াল-জবাবের সময়ে ওই ছাত্রীটি তাঁর অভিযোগ নিয়ে অবিচল ছিলেন। আবার, অভিযুক্ত শিক্ষক সবটাই অস্বীকার করেছেন। কমিটির কাছে ওই অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরের দাবি, এটি একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং তাঁকে সামাজিক ভাবে হেয় করার জন্যই এই ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে।

    সূত্রের খবর, তদন্তকারীদের সামনে চেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা সাক্ষীর অভাব। বিতর্কিত ওই কথোপকথনটি হয়েছিল একটি হোয়াটসঅ্যাপ কল–এ। সেই কল রেকর্ডেড না–হওয়ায় তার কোনও যান্ত্রিক বা ডিজিটাল প্রমাণ কমিটির হাতে আসেনি। তা ছাড়া, কথোপকথনের সময়ে তৃতীয় কেউ উপস্থিত না–থাকায় বিষয়টিকে ‘একজনের কথার বিরুদ্ধে অন্য জনের কথা’ হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে রিপোর্টে।

    বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘নিষ্ক্রিয়তার’ অভিযোগ তুলে ওই ছাত্রী আগেই জাতীয় তফসিলি জাতি কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সম্ভবত সেই চাপের মুখেই বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত তদন্ত শেষ করার পথে হাঁটে। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি, তবে তিনি বলেন, ‘রিপোর্ট এসেছে। রিপোর্টে যা পাওয়া গিয়েছে, সেটা আমরা কেন্দ্রীয় কমিশনে পাঠিয়ে দেবো।’

    বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, এই রিপোর্ট নিয়ে শিক্ষক ও পড়ুয়াদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা রয়েছে। বিশেষ করে, যেখানে দেশের সংবিধান ও আম্বেদকরের মতো ব্যক্তিত্বের নাম জড়িয়ে রয়েছে, সেখানে প্রমাণের অভাবে তদন্ত মাঝপথে থমকে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। তবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন জাতীয় তফসিলি জাতি কমিশনের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। বল তাই আপাতত দিল্লির কোর্টে।

  • Link to this news (এই সময়)