ভেজাল কারবারিদের দাপটে খেজুরের গুড়ে মেশানো হচ্ছে চিনি, কমছে স্বাদ
বর্তমান | ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
সংবাদদাতা, লালবাগ : ভেজালের দাপটে স্বাদ ও গন্ধ হারাচ্ছে ভোজনরসিক বাঙালির শীতের খেজুর গুড়। ফলে খাঁটি গুড়ের স্বাদ থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছে আমবাঙালি তেমনই খেজুর গুড়ের রকমারি মিষ্টির গুণমান বজায় রাখতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে মিষ্টি ব্যবসায়ীদের। মুর্শিদাবাদ জেলার মিষ্টি ব্যবসায়ীরা জানান, নায্য দাম দিয়েও খাঁটি গুড় মেলেনা। অর্ডার দিয়ে গুড় আনিয়ে মিষ্টি করেও হামেশাই খদ্দেরদের অভিযোগ শুনতে হচ্ছে। ক্রেতাথেকে ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, ভেজাল কারবারিদের রমরমা যেভাবে বাড়ছে তাতে হয়তো খুব শীঘ্রই বাজার থেকে খাঁটি শব্দটাই উবে যাবে।
শীতের আমেজ পড়তেই শিউলিদেরমধ্যে ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। বিকেলে খেজুর গাছে রসের হাড়ি লাগিয়ে ভোরে গাছ থেকে সেই হাড়ি নামিয়ে বাড়ি নিয়ে আসেন শিউলিরা। এরপরে শুরু হয় রস ফুটিয়ে গুড় তৈরির প্রক্রিয়া। প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা ফোটানোর পরে রসের ঘনত্ব বাড়ে এবং রং লালচে হতে শুরু করে। ঘনত্ব, স্বাদ ও গন্ধ ঠিকঠাক হলেই নামানো হয় সেই গুড়। শীতে খেজুর গুড় তৈরির এই ছবি গ্রাম বাংলার পরিচিত দৃশ্য। বর্তমান সময়ে ভেজাল কারবারিদের দাপটে এই চিত্র খানিক বদলেছে। উনুন, কড়াই, হাড়িতে খেজুরের রস এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু কড়াইয়ে রস ঢেলে ফোটানোর সময় থেকেই ছবিটাপাল্টে যাচ্ছে। রস ফুটতে শুরু করতেই অল্প অল্প করে চিনি মেশানো শুরু হয়। কারণ চিনি যত বেশি, মুনাফাও তত বেশি। মুর্শিদাবাদ থানার টেঁকপাড়ার বাসিন্দা ধনঞ্জয় মণ্ডল এক দশকের বেশি সময় ধরে শীতে খেজুর গাছ লিজ নিয়ে গুড়ের ব্যবসা করছেন। ধনঞ্জয়বাবু বলেন, এক কেজি গুড় তৈরি করতে ১০-১২ কেজি রস লাগে। জ্বালানির খরচ সহ এক কেজি গুড় বানাতে লাগে ১৩০-১৪০ টাকা। প্রতি কেজি গুড় ২০০ টাকার নীচে বিক্রি না করলে লাভ থাকে না। কিন্তু খদ্দেররা খাঁটি গুড়ের দাম ১৪০-১৫০ টাকার বেশি দিতে চান না। তাই বাধ্য হয়ে গুড় ফোটাতে গিয়ে চিনি মেশাতে হয়। নশিপুরে খেজুর বাগান লিজ নিয়েছেন পেশায় শিউলি হারুন রবিদাস। তিনি বলেন, সব গাছে সমান রস হয় না। রস বিক্রি করে যেমন লাভ হয় না তেমনই খাঁটি গুড় বেচে দামও মেলে না। গরিব শিউলিদের আর্থিক দুরাবস্থার সুযোগ নিয়ে খেজুর গুড়ের কারবারিরা ভেজাল দিতেশুরু করেছে। ঠাণ্ডা পড়ার আগেই ভেজাল কারবারিরা শিউলি পাড়ায় হানা দেয়। দাদন হাতে ধরিয়ে সব গুড় কিনে নেওয়ার চুক্তি করে তারা। ফলে কারবারিদের নির্দেশ মতো শিউলিরা গুড়ে চিনি মেশাতে বাধ্য হন।
জিয়াগঞ্জের এক মিষ্টি কারবারি বলেন, আগে শীতের সময় রসগোল্লা ও সন্দেশের মতো মিষ্টি খেজুর গুড় দিয়ে তৈরি করতাম। কিন্তু এখন ভেজালের দাপটে খেজুর গুড়ের মিষ্টি বিক্রি একপ্রকার বন্ধই করে দিয়েছি। শুধু রসগোল্লা ও সন্দেশ তৈরি করছি।