• হাইলি সাসপিশাস! নিজের গ্রামে আগন্তুক জটায়ু, শতবর্ষে প্রয়াত অভিনেতাকে নিয়ে অবহেলায় বিরক্ত এলাকাবাসী
    এই সময় | ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
  • রূপক মজুমদার, বর্ধমান

    'হাইলি সাসপিশাস!'

    অথবা সৈন্যরা যুদ্ধ ভুলে মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে দিয়েছে। ও দিকে এক জন মানুষ 'ছুটি, ছুটি' বলে মুক্তির আনন্দে পাগলপারা হয়ে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছেন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে!

    সংলাপ কানে এলেই চোখের সামনে ভাসে একটা মুখ। মাথা জোড়া টাক। কখনও প্রবল ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে গরম পোশাকে শরীর ঢেকে ফেলেন। জওহর কোটের বুকপকেটে কলম, আর এক পকেটে লাল রংয়ের নোটবই। সেখানেই তিনি প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে রাখেন। আবার সেই মুখটাই রাজার জোব্বা গায়ে চাপিয়ে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বুঝতে চান, চারপাশে কী ঘটছে!

    পর্দার জটায়ু অথবা হাল্লার বোকা রাজা, এবং বাস্তবের সন্তোষ দত্ত। তাঁকে নিয়ে আপামর বাঙালি এখনও আগের মতোই স্মৃতিমেদুর। শয়নে–স্বপনে তাঁর ছায়া ঘিরে রাখে সর্বক্ষণ। কিন্তু বাংলা সিনেমার সেই ব্যতিক্রমী অভিনেতাকে নিয়ে আদপে তেমন কোনও আবেগ আদৌ কাজ করে কি না, সেটা নিয়ে তর্কের আসর জমতেই পারে।

    অন্তত পূর্ব বর্ধমানের কুড়মুন–২ পঞ্চায়েতের সোনাপলাশি গ্রামে পা রাখলে মনে হয়, মানুষটার স্মৃতি কার্যত বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে। শতবর্ষে পা দিলেও এই গ্রামের অথবা সার্বিক ভাবে জেলার মানুষের হাবভাব দেখে মনে হয়, 'রাবণ রাজা সীতা মাইয়াকে সাথ জটায়ু পকসি কো হরণ' করে নিয়ে গিয়েছেন বিস্মৃতির জগতে!

    ১৯২৫-এর ২ ডিসেম্বর জন্ম এই অভিনেতার, এই সোনাপলাশি গ্রামেই। এখানেই ছোট দিদির বাড়িতে থেকে শেষ করেছিলেন প্রাথমিক পড়াশোনা। তার পরে পরিবারের সঙ্গে সটান পাড়ি কলকাতায়। পেশাগত ভাবে কড়া, দুঁদে আইনজীবী হলেও পর্দায় তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলিই বাঙালি দর্শকের মনে থেকে গিয়েছে জীবন্ত।

    তবে ওই পর্যন্তই! সোনাপলাশি গ্রামে পা দিলে তা বোঝার উপায় নেই। এখনও মামার বাড়ির দেওয়ালে রয়েছে তাঁর একটি ছবি। তবে সে–ও কেমন যেন মলিন! খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গ্রামে কিনেছিলেন জমি। সেই জমি সরকারি খাতায় তাঁর নামেই রেকর্ড হয়ে রয়েছে। প্রয়াত অভিনেতার ভাগ্নে লক্ষ্মীনারায়ণ চন্দ্র বলছিলেন, 'আমার মা ছিলেন সন্তোষ মামার ছোট বোন। আমাদের এই বাড়িতে উনি অনেক দিন ছিলেন। আমি তখন খুবই ছোট। পরে মায়ের থেকে মামাকে নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি।' যোগ করলেন, 'বড় হওয়ার পরে কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটে মামার বাড়িতেও গিয়েছিলাম। সেই সময়ে উনি ওকালতি করতেন।'

    লক্ষ্মীনারায়ণ জানালেন, মামার কেনা জমি এখনও অব্যবহৃত অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে। তবে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আগাছার জঙ্গল। কিন্তু এমন একটা ব্যক্তিত্বকে কী করে এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়, সেই উত্তর নেই ভাগ্নের কাছেও। সোনাপলাশি গ্রামেরই আর এক বাসিন্দা সুশান্ত চক্রবর্তী বললেন, 'ওঁর কেনা জমি এখনও পড়ে রয়েছে। সরকারি ভাবে তার রেকর্ডও রয়েছে। তবে ওঁকে কেন এত দিনেও ন্যূনতম স্বীকৃতি জেলা প্রশাসন অথবা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া গেল না, সেটা আমাদের মতো মানুষদের কাছেও এক বিস্ময়!' যোগ করলেন, 'এই গ্রামে এখনও উনি অনেকের কাছে জটায়ু–সন্তোষ নামেই পরিচিত হয়ে রয়েছেন।'

    বর্তমান প্রজন্মের ছেলে মহাদেব চক্রবর্তী বললেন, 'সিনেমা হলে গিয়ে হাঁ করে গিলেছি সোনার কেল্লা, হীরক রাজার দেশে। বাবা বলেছিলেন, এই মানুষটা কিন্তু আমাদের গ্রামেরই বাসিন্দা। ভাবতে অবাক লাগে, তাঁকে এ ভাবে ভুলে গিয়েছেন সবাই! কী ভাবে এই ধরনের ব্যক্তিত্বকে মনে রাখা দরকার, তার উপায়টা নাকি কেউ খুঁজেই পাচ্ছেন না। খুব খারাপ লাগে।'

    তবে সন্তোষ দত্তর প্রতি এমন উদাসীনতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হওয়ার বিষয়টি আঁচ করে নড়েচড়ে বসেছে কুড়মুন–২ পঞ্চায়েত সমিতি। পঞ্চায়েত প্রধান বাসুদেব দে বললেন, 'এই গ্রাম খুবই পুরোনো। কারও মনে হয়নি, এমন এক জন মানুষকে যথাযথ সম্মান দেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয়দের আবেগকে সম্মান জানিয়ে পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে সন্তোষ দত্তর সঙ্গে আরও দুই কিংবদন্তি নবদ্বীপ হালদার এবং লালবিহারী দে-র আবক্ষ মূর্তি তৈরি করা হবে। দুই অভিনেতার নামে রাস্তাও তৈরি হবে। খুব শিগগিরি কাজ শুরু হবে।'

    শেষ পর্যন্ত হবে তো? উত্তর এখনও ভবিষ্যতের গর্ভেই!

  • Link to this news (এই সময়)