• সাগর সঙ্গমে মিলেমিশে আমিষ-নিরামিষ
    আনন্দবাজার | ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
  • পুণ্যার্থীদের স্নানের ঘাট থেকে এগোলেই প্রশস্ত ঝাউ বন। এই ঝাউ বনেই সারাবছর মাছ শুকোতে দেন মৎস্যজীবীরা। গঙ্গাসাগর মেলার সময়ে সে সব বন্ধ। তার বদলে ঝাউ বনের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে থাকা প্রাঙ্গণে পুণ্যার্থীরা পলিথিন খাটিয়ে, কাঠকুটো জ্বেলে মাটির উনুনে রান্না করছেন। তবে শুঁটকি মাছ একেবারে হারিয়ে যায়নি। পুণ্যার্থীদের তাঁবুর আশপাশে থরে থরে শুঁটকি মাছের পসরা। বাঙালি তো বটেই, অবাঙালি পুণ্যার্থীদের কেউ কেউ কিনছেন সে সব।

    গঙ্গাসাগরে এ বার কুম্ভের ছায়া যতই থাক, বাংলার এই তীর্থে আমিষ-নিরামিষের দ্বন্দ্ব নেই।গঙ্গা আরতির প্রাঙ্গণ থেকে মন্দিরের দিকে এগোনোর পথে ডান হাতের গলিতে সার দিয়ে কম্বল, জামা, কাপড়ের দোকান। ওই সব দোকান ছাড়িয়ে এগোলেই সার দিয়ে খাবারের দোকান। মিষ্টির পাশাপাশি চাউমিন, মোগলাই, এমনকি, বিরিয়ানি পর্যন্ত। আবার মেলা মাঠের মূল রাস্তার পাশেই জ্বলজ্বল করছে, সুরুচি হিন্দু হোটেল। নিরামিষ খাবারের পসরা তাদের।চাউমিনে অবশ্য নিরামিষ-আমিষ ভেদ আছে। এক চাউমিন বিক্রেতা বললেন, “এগ চাউ বিক্রি হচ্ছে। তবে আমাদের দোকানে নিরামিষ কাউন্টার কিন্তু অন্য দিকে।” তবে তবে কোনও দোকানি শুধু নিরামিষ চাউ-ই বানাচ্ছেন। বলছেন, “দাদা, এক জন খদ্দেরের জন্য দশ জন খদ্দের ছেড়ে দিতে হবে।”সুরুচির কিছু দূরেই ‘পাঞ্জাবি ধাবা’। নামেই ধাবা, আদতে ছোট মাপের খাবারের দোকান। মালকিন বাঙালি মেয়ে শান্তি। স্বামী পঞ্জাবি। মিলছে রুটি, তরকারি। তবে দেওয়া হচ্ছে পেঁয়াজ। অবাঙালি মহলে পেঁয়াজ নিয়ে অত ছুতমার্গ চোখে পড়ল না।

    বাংলায় উৎসবে, তীর্থে আমিষ-নিরামিষ নিয়ে লড়াই আগে তেমন চোখে পড়ত না। কিন্তু গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক আবহে আমিষ-নিরামিষ দ্বন্দ্ব বড় আকার নিয়েছে। ব্রিগেডে গীতা পাঠের আসরে চিকেন প্যাটিস বিক্রেতার উপর হামলার অভিযোগও উঠেছিল। মঙ্গলবার পুরীর গোবর্ধন পীঠের শঙ্করাচার্য নিশ্চলানন্দ সরস্বতী এ দিন সাংবাদিক বৈঠকে গঙ্গাসাগর মেলাকে পুরোদস্তুর নিরামিষ করে তোলার পক্ষেই মত দিয়েছেন। তবে আমিষ বা মাংস খাওয়াকে পুরোপুরি বাতিল করেননি তিনি। তাঁর কথায় “ক্ষেত্রবিশেষে আমিষ খাবার দেশ রক্ষায় কাজে লাগে।” তাৎপর্যপূর্ণ, এ বার গঙ্গাসাগর মেলায় একটি মন্দির ট্রাস্টের উদ্যোগে নিরামিষ খাবার বিলির কথা শোনা গিয়েছে মেলা কর্তৃপক্ষের মাইক থেকেও।তবে আমজনতার আমিষ-নিরামিষ নিয়ে বাড়াবাড়ি নেই। উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার হনুমানগড়ি থেকেমেলায় এসেছেন চেতন দাস। আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক নিয়ে জিজ্ঞাসা করায় বললেন, “দুই-ই থাক। আজকাল বহু মানুষ এক এক দিন নিরামিষ খায়। পুরোটা মানতে বললে অনেকেই পারবেন না।”

    মেলা প্রাঙ্গণে পুলিশকর্মী, নানা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অনেকেই ডিম, মাছের খোঁজ করছেন। মেলা পুরোদস্তুর নিরামিষ হয়ে উঠলে তাঁরা কী করবেন? মেলা কি নিরামিষ হবে?নিশ্চলানন্দ সরস্বতীর মন্তব্য প্রসঙ্গে রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, “সবার সব মত শুনতে পারি। মতামত দিতে পারেন সবাই। কিন্তু কী হবে সেটা মেলা কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন।” আমিষ ও নিরামিষ দ্বন্দ্বে বাংলার মন্ত্রী কি একটু বেশি সাবধানী?
  • Link to this news (আনন্দবাজার)