বিক্রম দাস: শহরের অন্যতম নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজের (South Calcutta Law College incident) ভেতর আইনের ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া একধাপ এগোল। বুধবার আলিপুর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতে মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র ওরফে ‘ম্যাঙ্গো’ এবং তাঁর তিন সঙ্গীর বিরুদ্ধে চার্জগঠন সম্পন্ন হয়েছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গণধর্ষণ, অপহরণ এবং ব্ল্যাকমেলিংয়ের মতো একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। আগামী ২৭ জানুয়ারি থেকে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে।
অভিযুক্তদের পরিচয় ও অপরাধের ধারা
এই মামলার মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র ওই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (TMCP) নেতা ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি কলেজেরই অস্থায়ী কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মনোজিতের সঙ্গে তাঁর দুই সঙ্গী— প্রমিত মুখোপাধ্যায় ও জাইবের (জেব) বিরুদ্ধেও গণধর্ষণের চার্জ গঠিত হয়েছে। এ ছাড়াও ওই রাতে কর্তব্যরত নিরাপত্তারক্ষী পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেও সমপরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে গণধর্ষণ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও অপহরণের চার্জ আনা হয়েছে।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) যে ধারাগুলো এই মামলায় যুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো হলো:
৭০(১): গণধর্ষণ
১২৭(২): জোর করে আটকে রাখা
১৪০(৩) ও ১৪০(৪): অপহরণ
৬১(২): অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র
২৩৮: তথ্যপ্রমাণ লোপাট
এ ছাড়াও মোবাইল ফোনে ধর্ষণের দৃশ্য রেকর্ড করে ছাত্রীকে ব্ল্যাকমেল করা এবং প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগও চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে।
ফরেনসিক ও ডিএনএ রিপোর্টে অকাট্য প্রমাণ
কলকাতা পুলিশ এই মামলার তদন্তে বৈজ্ঞানিক প্রমাণকেই প্রধান হাতিয়ার করেছে। পুলিশি সূত্রে জানা গেছে, নির্যাতিতার পোশাক থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনা এবং মূল অভিযুক্ত মনোজিতের রক্তের ডিএনএ হুবহু মিলে গেছে। ডিএনএ রিপোর্ট নিশ্চিত করেছে যে ঘটনার সময় মনোজিৎ ওই স্থানে উপস্থিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, ধর্ষণের সময় ধস্তাধস্তিতে মনোজিতের শরীরে যে একাধিক ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, চিকিৎসকদের রিপোর্টে তার উল্লেখ পাওয়া গেছে। এই অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতেই চার্জশিট আরও জোরালো হয়েছে।
৮৩ জন সাক্ষী ও দ্রুত বিচার
বুধবার চার্জগঠনের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন বিশেষ সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় এবং নিরাপত্তারক্ষী পিনাকীর আইনজীবী দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য। আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় মোট ৮৩ জন সাক্ষী রয়েছেন। ২৭ জানুয়ারি থেকে পর্যায়ক্রমে তাঁদের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। প্রথম দফায় ৩৭ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে তলব করা হতে পারে। প্রশাসন চাইছে ফাস্ট-ট্র্যাক শুনানির মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব এই মামলার নিষ্পত্তি ঘটিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও জনরোষ
কসবা ল’ কলেজের ভেতর ছাত্রীকে আটকে রেখে এই নারকীয় নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শহরজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে কলেজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রক্ষী ও কর্মীর বিরুদ্ধেই যখন এই গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়। নির্যাতিতা ছাত্রীর অদম্য সাহসে অভিযোগ দায়ের করার পরই কলকাতা পুলিশ তড়িৎ গতিতে চারজনকে গ্রেফতার করে।
এখন ২৭ তারিখ থেকে শুরু হতে চলা বিচারপ্রক্রিয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে রাজ্যবাসী। আইনের ছাত্রীর ওপর চলা এই নৃশংসতার বিচার আইন আদালত কত দ্রুত দেয়, সেটাই এখন দেখার।