নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের জন্য এসআইআরকে ‘অস্ত্র’ করেছিল গেরুয়া শিবির। ‘দাওয়াই’এর জন্য নির্বাচন কমিশনের দরজায় দরজায় ঘুরেছিল তারা। মাস ঘুরতে না ঘুরতেই সেই অস্ত্রই এখন বুমেরাং হয়ে বিঁধছে পদ্ম শিবিরে। জেলায় মোট ‘আনম্যাপড’ ভোটার ৬৫হাজারের বেশি। তাঁদের সিংহভাগকেই ডাকা হয়েছে শুনানিতে। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র জেরে এখনও প্রচুর ভোটারকে শুনানিতে হাজির হতে হবে। সংখ্যাটা প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ বলে কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে চূড়ান্ত হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে বহু মানুষকে। উৎসবের দিনগুলিতেও ছাড় নেই শুনানিতে। হয়রানির জেরে বিজেপির উপর তিতিবিরক্ত সাধারণ মানুষ। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই ‘জটিলতা’কে হাতিয়ার করে প্রচার চালাচ্ছে ঘাসফুল শিবির। সেকারণে পাল্টি খেয়ে এখন বিজেপির দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে কমিশনের ব্যবস্থাপনায়। এতে বিজেপির কোনও হাত নেই।
বিজেপির অভিযোগ ছিল, রাজ্যের অন্যান্য জেলার পাশাপাশি বীরভূম জেলায়ও হাজার হাজার ভুয়ো ভোটার রয়েছে। যাদের জোরেই ভোট বৈতরণী পার হয়ে আসছে তৃণমূল। এই অভিযোগে সরব হয়েই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের দাবি তুলেছিল তারা। লক্ষ্য ছিল, তালিকা থেকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘ভুয়ো’ নাম ছেঁটে ফেলা। কিন্তু কাজের কাজ করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, বহু আদি বাসিন্দা, এমনকী বিজেপির কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিতদের নামও নথি বা যান্ত্রিক গোলমালের গেরোয় বাদ পড়ার তালিকায়। আর এই ‘বিপত্তি’কেই ইস্যু করে ময়দানে নেমেছে শাসকদল। রাজনৈতিক মহলের দাবি, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের হয়রানিতে সাধারণ মানুষের দরবারে ‘খলনায়ক’ তকমা এখন বিজেপির গায়েই সেঁটে যাচ্ছে।
কয়েকদিন আগে এসআইআরের শুনানিতে ডাক পেয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। শুনানিতে হাজির হতে হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামীর পরিবারের সদস্যদেরও। বুধবার মকর সংক্রান্তির দিনেও দুবরাজপুর, খয়রাশোল, সিউড়ি-১, মহম্মদবাজার সহ বেশ কয়েকটি ব্লকে শুনানি হয়েছে। এই জেলায় মকর সংক্রান্তির আলাদা গুরুত্ব হয়েছে। ঐতিহ্যপূর্ণ জয়দেবের মেলাও এদিন শুরু হয়েছে। জেলার মানুষজন মেলায় ভিড় জমান। তাছাড়া পিঠেপুলির উৎসবের জন্য বাসিন্দাদের মধ্যে আলাদা ব্যস্ততা ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে অনেকে শুনানিতে হাজির হন। এনিয়ে রীতিমতো তিতিবিরক্ত সাধারণ মানুষ। দুবরাজপুরের প্রতাপপুর থেকে ব্লক কার্যালয়ে শুনানিতে ডাক পেয়েছিলেন গ্রামের বহু মানুষ। যাঁরা অতীতে বিজেপিকে ভোট দিয়ে বিধানসভায় জিতিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, মকর সংক্রান্তির দিনও গ্রাম থেকে ১৬কিলোমিটার দূরে শুনানির জন্য ছুটতে হল। নথি না মিললে আবার যেতে হবে শুনছি। উৎসবের দিনেও এত হয়রানি কেন? প্রশাসনের এক কর্তা অবশ্য মনে করাচ্ছেন, বড়দিনের দিনেও শুনানি হয়েছে। উৎসবের দিনে এই শুনানির সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ কমিশনের।
হয়রানির জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ায় পাল্টি খাচ্ছে বিজেপি। ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে বিজেপির দাবি, তারা কেবল ‘ভুয়ো’ নাম বাদ দিতে চেয়েছিল, সাধারণ মানুষের হয়রানি নয়। দুবরাজপুরের বিধায়ক বিজেপির অনুপ সাহা বলেন, এসআইআর হচ্ছে কমিশনের ব্যবস্থাপনায়। এতে বিজেপির কোনও হাত নেই। তৃণমূল বিষয়টি মানুষের কাছে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে। তৃণমূলের জেলা কোর কমিটির সদস্য তথা বিধায়ক অভিজিৎ সিংহ বলেন, যে অস্ত্রে নিজেদের জমি শক্ত করতে চেয়েছিল পদ্ম শিবির, সেই অস্ত্রেই এখন ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে তারা। বিধানসভা নির্বাচনে এই হয়রানির জবাব দেবে সাধারণ মানুষ।