সুকমল দালাল, বোলপুর: জয়দেব কেঁদুলি মেলায় বাউল-ফকির, কীর্তনীয়াদের শতাধিক আখড়া। ‘মনের মানুষ’ নামে তেমনই এক আখড়ায় ভিড় জমিয়েছেন প্রচুর মানুষ। প্রখ্যাত বাউল শিল্পী তথা এই আখড়ার প্রতিষ্ঠাতা সাধন দাস বৈরাগ্য। তিন বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ‘মনের মানুষ’ বাউল প্রেমীদের মনের অন্দরে। মকর সংক্রান্তির দিনে জয়দেবের পুণ্যভূমিতে সেই আখড়ায় পা রাখলেই তা মালুম হয়। পঞ্চভূতে বিলীন হয়েও সাধন দাস বৈরাগ্য থেকে গিয়েছে তাঁর সাধন ক্ষেত্রে, অসংখ্য ভক্তের হৃদয়ে।
প্রথিতযশা বাউলশিল্পী ছিলেন সাধন দাস। দীর্ঘদিন ধরে বাউলের দেহতত্ত্ব গানের চর্চা করতেন। জানা যায়, পূর্ব বর্ধমানের মুক্তিপুর গ্রামে সাধনের জন্ম। প্রথমে বর্ধমানের হাটগোবিন্দপুর এবং পরে খণ্ডঘোষ ব্লকের আমরুল গ্রামে ‘সদানন্দের হাট’ নামে একটি আশ্রম তৈরি করেন তিনি। সঙ্গীত সাধনা শুরু ছেলেবেলা থেকেই। একতারা হাতে মানবজীবনের গভীর তত্ত্বকে সহজ সুরে তুলে ধরাই ছিল তাঁর সাধনা। বাংলার মাটি পেরিয়ে তাঁর কণ্ঠ পৌঁছেছিল দেশের নানা প্রান্তে। দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বিদেশের মঞ্চেও। জাপানে গিয়ে তিনি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সেখানেও তৈরি হয় তাঁর বহু শিষ্য।
শুধু গানেই নয়, বাউল দর্শন ও দেহতত্ত্ব নিয়ে লেখালেখির মাধ্যমেও তিনি রেখে গিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। দেশ-বিদেশের নানা প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন সম্মান-স্বীকৃতি। গুরু-শিষ্য পরম্পরাকে আঁকড়ে ধরেই জয়দেবে গড়ে তুলেছিলেন ‘মনের মানুষ’ আখড়া। প্রতি বছর জয়দেব-কেঁদুলি মেলায় বাউল সাধনার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সাধন দাস আর নেই। কিন্তু তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করেই শিষ্যরা ‘মনের মানুষ’ আখড়াকে প্রতি বছরই ভরিয়ে রাখেন বাউল-সাধনায়। এ বছরও আখড়া চত্বর জুড়ে সাজানো ছিল সাধনের ছবি ও কাটআউট। তাঁর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে জানানো হয় শ্রদ্ধা। আখড়ায় আনন্দ বটের নিচে ধুনুচি জ্বালিয়ে শুরু হয় বাউল গানের আসর। দিনভর প্রসাদ বিতরণ ও গানের মধ্য দিয়ে গুরুকে স্মরণ করেন জয়দেব মেলায় আগত তাঁর শিষ্য সহ প্রচুর মানুষ। যা প্রমাণ করে নিজের সাধন আখড়ায় সাধন আজও অমর।