• আইপ্যাক মামলার সুপ্রিম-শুনানি: মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ইডির, জোরদার সওয়াল সিবাল-সিংভিরও
    এই সময় | ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
  • আইপ্যাক অভিযান নিয়ে ইডির দায়ের মামলার শুনানি চলছে সুপ্রিম কোর্টে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র ও বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির ডিভিশন বেঞ্চে ওই মামলার শুনানি হচ্ছে। ইডির তরফে আদালতে সওয়াল করছেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি অভিযোগ করেন, ‘তাজ্জব ঘটনা ঘটেছে গত ৮ জানুয়ারি। মুখ্যমন্ত্রী নিজে তদন্তে বাধা দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীকে সহায়তা করেছেন ডিজিপি, পুলিশ কমিশনার ও কলকাতা পুলিশের ডিসি-সাউথ। উর্দি পরে এর আগে তাঁরা ধরনাও দিয়েছেন।’ ডিজিপি রাজীব কুমার, কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা ও ডিসি সাউথ প্রিয়ব্রত রায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানিয়েছে ইডি।

    গত সপ্তাহের ৮ জানুয়ারি, কয়লা পাচার মামলায় কলকাতায় অভিযান চালায় ইডি। হানা দেয় সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিস ও আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে। সেই অভিযান চলাকালীনই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতীকের বাড়ি ও আইপ্যাকের অফিসে পৌঁছে যান। ইডির অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী তদন্তে বাধা দেন। ইডি আরও অভিযোগ তোলে, অভিযান চলাকালীনই মুখ্যমন্ত্রী বেশ কিছু ফাইল তদন্তকারীদের থেকে কেড়ে নেন।

    তুষার মেহতা এ দিন আদালতে সওয়াল করেন, একটি সংস্থার অফিস এবং তার কর্ণধারের বাড়িতে তল্লাশি করা হয়েছে৷ ইডি লোকাল থানাকে জানিয়ে তল্লাশি করতে গিয়েছিল। যে নথি বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা হয়েছে, সেই নথি, এমনকি একজন ইডি-র এক অফিসারের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন মুখ্যমন্ত্রী। হতবাক এবং স্তব্ধ করে দেওয়ার মত ঘটনা এটা। এই ধরনের ঘটনা কেন্দ্রীয় বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেবে। অন্য দিকে, রাজ্যের পুলিশ মনে করবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে কোনও অভিযানে বাধা দেওয়া ক্ষমতা রয়েছে তাদের। যে পুলিশ আধিকারিকরা কেন্দ্রীয় তদন্তে বাধা দিয়েছেন, তাঁদের সাসপেন্ড করে বিভাগীয় তদন্ত করা হোক।

    বিচারপতি মিশ্র এর পরেই প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা চাইছেন, আমরা সাসপেন্ড করি তাঁদের?’ তুষার মেহতা জানান, যাঁরা সাসপেন্ড করবেন, তাঁদের নির্দেশ দেওয়া হোক। এই প্রসঙ্গে রাজীব কুমার কলকাতার সিপি থাকাকালীন সিবিআই অভিযানের প্রসঙ্গও আদালতে উত্থাপন করেন মেহতা। তিনি বলেন, ‘এখন যিনি ডিজি, সেই সময়ে তিনি ছিলেন সিপি। তিনি নিজে এবং তাঁর পুলিশ সিবিআইকে তদন্তে বাধা দিয়েছিলেন। রাজ্যের আইনমন্ত্রী আদালতে ঢুকে গিয়েছিলেন ৫ হাজার লোক নিয়ে, স্লোগান তুলে শুনানি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমরা সেই ঘটনাও দেখেছি।’

    একই সঙ্গে গত শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে যে ঘটনা ঘটেছিল, তারও উল্লেখ করা হয় এ দিন শীর্ষ আদালতে। ইডির আইনজীবী তুষার মেহতা বলেন, ‘আমরা হাইকোর্টকে জানিয়েছি, কী ভাবে মবক্রেসি (Mobocracy) ডেমোক্রেসির দখল নেয়। আদালত কক্ষের পরিবেশ সুষ্ঠু শুনানির জন্য আদর্শ ছিল না। রাজ্যের শাসকদলের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট আমরা পেশ করতে পারি। শাসকদলের লিগাল সেল থেকে সবাইকে মেসেজ পাঠানো হয়েছে, ৯ জানুয়ারি ১০ নম্বর কোর্টে উপস্থিত থাকার জন্য। কনভেনর অমিতকুমার দাস নির্দেশ দিয়েছেন।’ যা শুনে বিচারপতি মিশ্র প্রশ্ন করেন, ‘এটা কি যন্তর মন্তর নাকি, সবাইকে ডাকা হচ্ছে?’ তুষার মেহতা বলেন, ‘একদম, যন্তর মন্তর।’

    এ দিন সুপ্রিম কোর্ট জানতে চায়, ইডি কেন হাইকোর্টে গিয়েছিল। ইডির তরফে জানানো হয়, ‘কয়লা পাচার দুর্নীতির তদন্তে। ডোমেস্টিক এবং আন্তর্জাতিক হাওয়ালা লেনদেন করা হয়েছে। ২০ কোটি টাকা কলকাতা থেকে গোয়ায় পাচার করা হয়েছে। প্রামাণ্য নথি আছে আন্তঃরাজ্য হাওয়ালা সিন্ডিকেটের।’

    এ দিন আদালতে ওঠে প্রশান্ত কিশোরের নামও। বিচারপতি মিশ্র জানতে চান, ‘এটা কি সেই আইপ্যাক, যেখানে আগে জড়িত ছিলেন মিস্টার প্রশান্ত কিশোর?’ যার জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলেন তুষার মেহতা। তিনি জানান, লোকাল থানায় ইমেল করে ইডি জানিয়েছিল তদন্ত-তল্লাশির কথা। এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কোনও সম্পর্ক নেই৷ তার পরেও ৯ তারিখ মুখ্যমন্ত্রী আসেন। ডিসি সাউথ ঘটনাস্থলে গিয়ে দাবি করেন, জোর করে ওই বাড়িতে ঢুকে পড়া হয়েছে বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ এসেছে। তখন ইডি অফিসাররা তাঁদের সরকারি পরিচয়পত্রও দেখান। এর পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছন সিপি মনোজকুমার ভার্মা। তার পরেই আসেন মুখ্যমন্ত্রী। তুষার মেহতা বলেন, ‘পুলিশ ও মুখ্যমন্ত্রী সব নথি, ইডি অফিসারের মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যান। এটা প্রথম বার হয়নি, বার বার একই জিনিস হচ্ছে। গায়ের জোরে একই ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, সরকারি কাজে বাধাদান করা হচ্ছে। দুর্নীতির তদন্ত করতে দেওয়া হচ্ছে না। যে ভাবে সব নথি নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাতে আমাদের মনে হচ্ছে সব প্রমাণ ধুয়ে ফেলা হয়েছে।’ আদালতে কিছু ফটোগ্রাফও পেশ করে ইডি।

    বিচারপতি পিকে মিশ্র এর পরেই জানায়, তারা নোটিস জারি করছে। তিনি বলেন, ‘এটা খুবই সিরিয়াস বিষয়। আমরা এটা খতিয়ে দেখতে চাই৷ যে ভাবে হাইকোর্টের শুনানিতে বাধা দেওয়া হয়েছে, আমরা খুবই ডিস্টার্ব বোধ করছি।’ আদালত জানতে চায়, রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন কে পরিচালনা করে, নির্বাচন কমিশন না আইপ্যাক?

    মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী কপিল সিবাল সওয়াল করেন, এই মামলার শুনানি করা উচিত কলকাতা হাইকোর্টের। ৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে বিশৃঙ্খলা হলেও ১৪ জানুয়ারি হাইকোর্টেই শুনানি হয়েছে, তা উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে আইজীবী সিবাল আদালতকে জানান, ২০২১ সালে আইপ্যাকের সঙ্গে চুক্তি হয় তৃণমূলের। ইডি জানত যে, এই অফিসে তল্লাশি চালালে নির্বাচন সংক্রান্ত প্রচুর তথ্য পাওয়া যাবে। ভোটের মুখে এই তল্লাশির কী প্রয়োজন? ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কয়লা পাচার মামলার তদন্তে শেষ পদক্ষেপ করা হয়। তার পরে ইডি কী করছিল? ইডির পঞ্চনামা প্রমাণ দিচ্ছে, ইডি মিথ্যা বলছে।

    আইনজীবী সিবাল বলেন, ‘৬৬ পাতায় দেখুন, সকাল ৬টায় তদন্ত শুরু করে দুপুর ১২টা ৫ পর্যন্ত কোনও সিজ়ার করা হয়নি। প্রতীক জৈনের ল্যাপটপে সব তথ্য জমা ছিল। নির্বাচন সংক্রান্ত সব তথ্য। আইফোনেও তথ্য ছিল। মুখ্যমন্ত্রী সেই ল্যাপটপ এবং আইফোন নিয়ে যান। এখানে তাঁর দলের প্রয়োজনীয় তথ্য ছিল। কাউকে বাধাদান করা হয়নি। ইডি সই করেছে।’

    আইনজীবী সিবাল আদালতে আরও জানান, ইডি যা দাবি করছে, তাদের পঞ্চনামায় ঠিক উল্টো দাবি করা হয়েছে। ভোট প্রক্রিয়ার আগে বিশৃঙ্খলা করাই লক্ষ্য। এই তল্লাশি কার সুবিধের জন্য করা হয়েছে, সে প্রশ্নও করেন সিবাল। ফের কলকাতা হাইকোর্টে শুনানির পক্ষে সওয়াল করেন তিনি।

    যদিও বিচারপতি মিশ্র বলেন, 'এখন কলকাতা হাইকোর্টে হয়েছে, পরে সারা দেশের হাইকোর্টে হবে একই ঘটনা, এটা চলতে পারে না।’ মামলার সঙ্গে যুক্ত অন্যদের আইনজীবী অভিষেক মনুসিংভি বলেন, 'একটা ক্যাজুয়াল ইমেলে প্রথম তথ্য জানানো হয়েছে। সকালে ৬টা ৪৫-এ তল্লাশি চালানো হয়েছে। ইমেল করা হয়েছে ১১টা ৩০ মিনিটে। ইমেল পাঠানোর ৫ ঘণ্টা আগে তল্লাশি চালানো হলো কী করে? এটা কভার আপ করার পরিকল্পনা।’ একই সঙ্গে পুলিশের সেখানে উপস্থিতি প্রসঙ্গে মনুসিংভি জানান, মুখ্যমন্ত্রী জেড প্লাস ক্যাটিগরির নিরাপত্তা পান। ফলে তিনি যেখানে যাবেন, পুলিশকে যেতেই হবে।

    আপাতত লাঞ্চ বিরতি চলছে। বিরতিতে যাওয়ার আগে বিচারপতি পিকে মিশ্র ইডির কাছে জানতে চেয়েছেন, ‘কেন এই মামলার শুনানি আপনারা কলকাতা হাইকোর্টে করতে চাইছেন না?’

  • Link to this news (এই সময়)