আজকাল ওয়েবডেস্ক: শীতের মরশুমে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ও পর্যটন কেন্দ্রে ঢালাও বিক্রি হয় খেজুরের রস। পর্যটকরা সেটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। তবে চিকিৎসক মহলের মতে, এই টাটকা খেজুরের রসের মধ্যে দিয়েই আপনার শরীরে চুপিসারে বাসা বাঁধতে পারে ভয়ঙ্কর 'নিপা' ভাইরাস। গত কয়েকদিন আগে পশ্চিমবঙ্গে 'নিপা' ভাইরাসের হদিস মেলায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকও। রাজ্যে বহু মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।
বেশ কিছু চিকিৎসক এই মুহূর্তে খেজুরের রস খাওয়ার আগে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়ার পরই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কমছে গাছ থেকে নামানো টাটকা খেজুরের রসের চাহিদা। শীতের মরসুমে গ্রামেগঞ্জে সকাল সকাল খেজুরের রস খাওয়ার যে আকর্ষণ ছিল তা 'নিপা' আতঙ্কে গত দু-তিন দিনে অনেকটাই কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নিপা ভাইরাসের অন্যতম বাহক বাদুড় রাতেরবেলা অনেক সময় খেজুর গাছে বাঁধা হাঁড়িতে মুখ দেওয়ার ফলে তাদের মুখ থেকে সেই ভাইরাস হাঁড়ির রসে মিশে যেতে পারে এবং সেই কাঁচা রস কেউ পান করলে নিপা ভাইরাস সরাসরি তাঁর দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে যাঁরা আসবেন তাঁদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে এই মারণ ভাইরাস। তাই চিকিৎসক মহলের পরামর্শ অনুযায়ী এখন গাছ থেকে নামানো টাটকা খেজুরের রস খাওয়া খুব একটা নিরাপদ নয়। কিন্তু এই রসকে বেশ কিছু সময় ধরে ফুটিয়ে গুড় করা হলে ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে। তাই বাজারে গুড়ের চাহিদা থাকলেও টাটকা খেজুর রসাস্বাদন করতে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন খেজুর রসপ্রেমীরা।
প্রসঙ্গত, এর আগে ২০০১ এবং ২০০৭ সালে নিপা সংক্রমনের ঘটনা ঘটেছিল পশ্চিমবঙ্গে। যার সঙ্গে খেজুর রসের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল। দীর্ঘ ১৯ বছর পর ফের বঙ্গে ফিরেছে নিপা আতঙ্ক। ইতিমধ্যেই দু'জন নার্সের শরীরে এই রোগের হদিস মিলেছে। স্বাস্থ্যদপ্তর, চিকিৎসক এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে বারবার সাধারণ মানুষকে সচেতন করবার চেষ্টা করা হচ্ছে।এই মুহূর্তে খেজুরের রস খেতে নিষেধ করছেন চিকিৎসকমহল। তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রস ফুটিয়ে বা তার থেকে গুড় তৈরি করে খেলে তা নিরাপদ। কারণ দীর্ঘক্ষণ উচ্চতাপমাত্রায় ফোটানোর ফলে ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু গাছ থেকে সদ্য নামানো রস অত্যন্তই ঝুঁকিপূর্ণ। এই সতর্কতার পর অনেকেই পুরোপুরি খেজুরের রস এড়িয়ে চলছেন।
ডাক্তারদের সতর্কতার পর মুর্শিদাবাদ-সহ রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে খেজুরের রস বিক্রেতারা পড়েছেন চরম বিপাকে। অনেকেই গাছে রাতে হাঁড়ির সঙ্গে নেট বা বাঁশের 'বানা' লাগিয়ে বাদুর ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক কমছে না। ফলে যে রস সংগ্রহ হচ্ছে তার বেশিরভাগটাই ব্যবহার হচ্ছে গুড় তৈরিতে। এমন পরিস্থিতিতে খেজুর গুড়ের উৎপাদন বাড়লেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় আগামী দিন খেজুরের গুড়ের দাম কমার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাজারে ইতিমধ্যে কিছু জায়গায় নলেন গুড়ের দর ১০ -২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে শুরু করেছে। মকর সংক্রান্তির সময় পিঠে পুলির জন্য গুড়ের চাহিদা থাকলেও কাঁচা রসের বিক্রি কমায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
প্রত্যেক বছর শীত পড়ার আগেই মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের বাসিন্দা মুজাফ্ফর শেখ চলে আসেন রানীনগরে। মাস তিনেক সেখানে থেকেই খেজুর রস সংগ্রহের কাজ করেন তিনি। সারা বছর ধরে অতিরিক্ত কিছু রোজগারের আশায় দিন গোনেন মুজাফফর। কিন্তু এবছর নিপা আতঙ্কে বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাঁকে। স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে পর্যটক অনেকেই মুখ ফিরিয়েছেন খেজুর রস থেকে। মুজাফ্ফর বলেন, একটি খেজুর গাছ থেকে প্রতিদিন ২-৩ লিটার রস পাওয়া যায়। তবে সপ্তাহে ৭ দিন গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয় না। আগের সপ্তাহ পর্যন্ত যে খেজুরের রস ৫০ টাকা প্রতি লিটার দরে বিক্রি করেছি, এখন সেই খেজুরের রস ৩০ টাকায় বিক্রি করতে চাইলেও কেউ খেতে চাইছেন না। বাধ্য হয়ে সেই রস গুড় তৈরির কাজে ব্যবহার করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, "আমাদের আশঙ্কা গুড় চাহিদার তুলনায় বেশি তৈরি হলে সেক্ষেত্রে গুড়ের দাম কমাতেও অনেকে বাধ্য হবে। দু'দিক থেকেই লোকসান হবে আমাদের।'
সুতির বাসিন্দা নিতাই মন্ডল বলেন, "শীতের সকালে আগে প্রচুর মানুষ খেজুর রস খেতে আসতেন। নিপা ভাইরাসের ভয়ে গত কয়েকদিন লোকজন আগের মতো আর খেজুর রস খাচ্ছেন না। তাই আমরা খেজুর রস বিক্রি করার বদলে গুড় তৈরি করছি। রসকে অনেকক্ষণ ধরে ফোটানোর পরে খেজুর গুড় তৈরি হয়। ফলে তা থেকে ভয়ের কোনও কারণ নেই।"
লালবাগের বাসিন্দা সায়রা বিবির কথায়, "আমরা মূলত গুড় বিক্রি করি। তবে সকালে অনেকেই খেজুরের টাটকা রস খেতে আসতেন। রস থেকে যে মানুষের অসুখ হতে পারে, এটা আমার জানা ছিল না।" রঘুনাথগঞ্জের রবিউল শেখ যদিও দাবি করেন, "আমি যে ভাবে খেজুর রস সংগ্রহ করি, তাতে বিপদের কোনও আশঙ্কা নেই। খেজুর গাছের মাথায় একটা সরু বাঁশের চোঙ বানিয়ে তাতে কলসী বাঁধা থাকে। খেজুর রসে যাতে কোনও পোকামাকড় না পড়ে এবং বাদুড়রা যাতে তাতে মুখ দিতে না পারে, তার জন্য সূক্ষ্ম সুতোর জালি দিয়ে কলসীর মুখটা ঢেকে রাখা হয়। কিন্তু এত সতর্কতার সঙ্গে খেজুরের রস সংগ্রহ করা হলেও নিপা আতঙ্কে সাধারণ মানুষ খেজুর রস খেতে চাইছেন না।"
তবে এই আতঙ্কের মাঝেও একটি ইতিবাচক দিক হল মানুষ এখন স্বাস্থ্য সম্পর্কে যথেষ্টই সচেতন। শীতের মরসুমে মিষ্টি খেজুরের রসের লোভ সামলানো কঠিন হলেও নিরাপদ পথ বেছে নিয়ে সুস্থ থাকাই এখন সকলের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।