• ফের আত্মঘাতী BLO! রহস্য অডিয়ো ক্লিপে, জেলায় জেলায় পদত্যাগ জারি
    এই সময় | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে আনন্দপুরের ছিটকালিকাপুরে এক বুথ লেভেল অফিসারের(বিএলও) ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে মুকুন্দপুরের অহল্যানগরের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহরু হাই স্কুলের শিক্ষক অশোক দাসের (৪৮) নিথর দেহ। পেশায় শিক্ষক হলেও অশোক ছিটকালিকাপুর এফপি স্কুলের ১১০ নম্বর বুথের বিএলও এবং স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার)-এর দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হচ্ছে রহস্যের কালো মেঘ। পরিবারের দাবি, শৌচাগার থেকে অশোকের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনাটি আদতে চরম মানসিক চাপের পরিণাম। মৃতের স্ত্রী সুদীপ্তা দাসের স্পষ্ট অভিযোগ, ‘সার’ সংক্রান্ত কাজের যে বিপুল চাপ তৈরি হয়েছিল, তা সহ্য করতে না পেরেই তাঁর স্বামী আত্মঘাতী হয়েছেন। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, দানা বেঁধেছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগও।

    বিজেপি নেতা সজল ঘোষের একটি ভাইরাল অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির উত্তাপ কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। ওই অডিয়োতে (যার সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময়’) দাবি করা হয়েছে, ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলার অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর অনুগামী রাজু বিশ্বাস মৃত বিএলও-কে ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছিলেন। বিজেপি নেত্রী মৌসুমি দাসের সঙ্গে মৃতের স্ত্রীর ওই কথোপকথনে পুরোটা বোঝা যাচ্ছে বলে দাবি করেন সজল। ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা গেলে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকির জেরে গভীর অবসাদে ভুগছিলেন অশোক। এমনকী তাঁর পরিবারকেও টার্গেট করে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। যদিও কাউন্সিলার অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় সমস্ত অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়ে একে বিজেপির রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও ষড়যন্ত্র বলে পাল্টা দাবি করেছেন। অনন্যার বক্তব্য,‘আমি ওঁকে দীর্ঘদিন ধরে চিনতাম। রাজনৈতিক কারণে আমার নামে মিথ্যা কুৎসা করা হচ্ছে।’ তাঁর দাবি, ‘অশোকবাবুর বুথে বেশিরভাগ কাজই শেষ হয়েছিল, ফলে বাড়তি চাপের কোনও প্রশ্নই নেই।’ পুলিশ আপাতত অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে।

    সজলের কথায়, ‘এই ফোনটাকে যদি কেউ মিথ্যা বলে তাহলে তাঁর জন্ম বৃত্তা‍ন্ত মিথ্যা। অসহায় স্ত্রী স্বামীকে হারিয়ে ফোনে পুরোটা জানান। ওঁরা তৃণমূল করতেন। তাহলে বিজেপির শেখানো কথা কী করে বলবেন? নিজেদের সৈনিকের রক্তের কোনও গুরুত্ব নেই এঁদের কাছে। শেষ পর্যন্ত ওই পরিবার আদৌ অভিযোগ করতে পারবে কি না, সন্দেহ রয়েছে। তৃণমূল শান্তিতে ওঁদের চোখের জলও ফেলতে দিচ্ছে না।’ এদিন ঘটনাস্থলে কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা ব্যক্তিগতভাবে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে যান। কিন্তু হাসপাতাল চত্বরে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময়ে তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে ধস্তাধস্তি এবং মৃতের পরিবারকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে অশান্তি ছড়ায় বাইপাস সংলগ্ন এলাকায়।

    কলকাতার এই মৃত্যু সংবাদের মধ্যেই আবার জেলাগুলিতেও নির্বাচন কমিশনের ‘সার’ বা নিবিড় সংশোধন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ছে। কমিশনের দেওয়া তথ্যে অসঙ্গতি বা ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’-র কারণে বৈধ ভোটারদের দফায় দফায় শুনানিতে ডাকার যে নির্দেশ আসছে, তাতে বিএলও-রা কার্যত সাধারণ মানুষের রোষের মুখে পড়ছেন। ঝাড়গ্রাম ব্লকের রাধানগর গ্রাম পঞ্চায়েতের জয়নগর এলাকায় এ দিন শুনানির নোটিস দিতে গিয়ে বিএলও দিলীপ মণ্ডল গ্রামবাসীদের হাতে ঘেরাও হন। গ্রামবাসীদের সাফ কথা, ২০ বছরের পুরোনো ভোটার হওয়া সত্ত্বেও কেন তাঁদের বারবার হয়রান করা হচ্ছে, তার সদুত্তর বিএলও-র কাছে নেই। ঝাড়গ্রামের জেলাশাসক আকাঙ্ক্ষা ভাস্কর যদিও জানিয়েছেন, কমিশনের নির্দেশে এই নোটিস পাঠানো হচ্ছে।

    একই চিত্র নদিয়ার চাপড়াতেও। সেখানে বিডিও অফিসের সামনে বিএলও–রা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের প্রতিনিধি আজিজুল আলম মণ্ডলের অভিযোগ, ‘কমিশনের নির্দেশগুলো এতটাই জটিল যে সাধারণ মানুষকে তা বোঝানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এমনকী বৈধ ভোটারদেরও রোষের মুখে পড়তে হচ্ছে নোটিস দিতে গিয়ে।’ বিডিও-র কাছে স্মারকলিপি দিতে গেলেও তাঁদের পুলিশি বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে বলে অভিযোগ।

    পরিস্থিতি সবথেকে ভয়াবহ আকার নিয়েছে উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি এবং ফরাক্কায়। জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের গড়ালবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতে এ দিন ১৭ জন বিএলও গণ-ইস্তফা দিয়ে পঞ্চায়েত অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন। বিএলও আমজাদ আলির দাবি, ‘একবার শুনানি হওয়ার পরেও কৃত্রিমভাবে ভুল বের করে হাজার হাজার মানুষকে নোটিস দেওয়া হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ তথ্য আপলোড করা এবং মানুষকে শুনানিতে হাজির করানো এই সামান্য সময়ের মধ্যে অসম্ভব এবং চরম মানসিক চাপের।’ কমিশনের নির্দেশিকা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় সাধারণ মানুষ এখন বিএলও-দের শত্রু হিসেবে দেখছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

    অন্যদিকে, ফরাক্কায় বুধবার বিডিও অফিস ভাঙচুরের ঘটনার পরে বৃহস্পতিবার নিরাপত্তার অভাবে ১০ জন মাইক্রো অবজার্ভার ইস্তফা পত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনে। এর আগে ফরাক্কার প্রায় ২০০ জন বিএলও ইস্তফা দিয়েছিলেন। যদিও জেলা প্রশাসন সেই ইস্তফা গ্রহণ করেনি। বুধবার ভাঙচুরের ঘটনায় চারজন তৃণমূল কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফরাক্কায় বৃহস্পতিবার শুনানির কাজ চার ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়। সব মিলিয়ে মুকুন্দপুরের রহস্যমৃত্যু থেকে শুরু করে জেলাগুলির গণ-ইস্তফা ও আন্দোলন— নির্বাচন কমিশনের ‘সার’ কর্মসূচি এখন বিএলও-দের কাছে কার্যত অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা রাজ্যের প্রশাসনিক ও নির্বাচনী কাজের পরিবেশকে এক গভীর সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের দাবি। এ দিন কলকাতায় রাজ্য নির্বাচন কমিশনের অফিসে (সিইও) এনিয়ে বিক্ষোভ দেখায় তৃণমূলপন্থী বিএলও-দের সংগঠন।

  • Link to this news (এই সময়)